edited-আসন্ন ইজতিমা : ইজতিমা যেন হয় দ্বীনী ইজতিমা – আবুল হাসান আব্দুল্লাহ

টঙ্গির ময়দানে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব ইজতিমা সন্নিকটে। মুসলমানদের মাঝে ঈমানী চেতনা জাগ্রত করার এবং দ্বীনমুখী জীবনের আগ্রহ পয়দা করার দাওয়াত নিয়ে প্রতিবছর আমাদের দেশে এই ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এদিক থেকে এটি একটি মোবারক ইজতিমা। এটি যেন তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে সফল হতে পারে, ইজতিমার নানাবিধ মেহনতের দ্বারা যেন মুসলমানের মাঝে দ্বীনের উপর চলার প্রেরণা জাগে, আল্লাহর ভয় ও আখিরাতে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, পার্থিব পদ-পদবী, অর্থ-বিত্তের মোহ-জাল থেকে বেরিয়ে এসে আখিরাতমুখী জীবন-যাপনের গুরুত্ব বুঝে আসে এবং পার্থিব স্বার্থে পরস্পরের হক নষ্ট করার পরিবর্তে আখিরাতের স্বার্থে একে অপরের হক রক্ষার চেতনা জাগে- এর জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে যেমন দুআ ও রোনাজারি প্রয়োজন তেমনি নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মেহনত-মুজাহাদাও প্রয়োজন।

ইতিপূর্বে ইজতিমার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। দ্বীনী-দাওয়াতের এই পন্থার সক্রিয় কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মোটামুটি একমত ছিলেন। কারণ, মৌলিকভাবে যিম্মাদারগণের কর্মপন্থা সঠিক ছিল। আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠতম বান্দা- আম্বিয়ায়ে কেরামের আযমত, শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আযমত ও মহব্বত এবং সাহাবায়ে কেরাম রিদওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমায়ীনের আদব ও ইহতিরাম এবং দ্বীনের অন্যান্য ক্ষেত্র ও সহীহ পন্থার কাজসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন ছিল এই মেহনতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য । কিছু ভুল-ত্রুটি ও নিজেদের মাঝে ছোটখাটো মতভেদ থাকলেও বড় ধরনের বিচ্যুতি ও বিভেদ ছিল না। কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দাওয়াতের মেহনতের এই পন্থার কর্মীরা নিজেরাই এখন বিভক্ত। শুধু বিভক্তই নয়, অনেকের কথা ও কাজ শরীয়তের সীমা ও গণ্ডিরও বহির্ভূত। এই পরিস্থিতিতে সতর্কতা ও সচেতনতা যেমন অনেক বেশি প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন আল্লাহর দিকে বেশি বেশি রুজু করা।

তাবলীগ জামাতের বর্তমান বিভেদ-বিভক্তির মূল কারণটি ইতিমধ্যে মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এই মেহনতের সক্রিয় ও শুভাকাঙ্ক্ষী উভয় শ্রেণির উলামায়ে কেরাম দীর্ঘ সময় পর্যন্ত খুসুসী ইসলাহ ও সংশোধনের চেষ্টার পর অবশেষে বিচ্যুতির বিষয়গুলো সম্পর্কে সর্বস্তরের মুসলিম জনগণকে সতর্ক করার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের কর্মপ্রয়াসের ফলে এই মেহনতের নেতৃত্বে থাকা কারো কারো মারাত্মক বিভ্রান্তিগুলো বিভ্রান্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। আল্লাহ না করুন আলিমগণ যদি এই বিষয়ে দৃঢ় ভূমিকা না রাখতেন তাহলে এই মেহনত সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার এবং সাধারণ মুসলমানের অনেক বড় দ্বীনী ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রত্যেক যুগের আলিম-উলামার এক অবশ্যপালনীয় কর্তব্য, দ্বীনকে গুলুকারীদের তাহরীফ থেকে, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার থেকে এবং অজ্ঞ লোকদের অপব্যাখ্যা থেকে মুক্ত করা। এই দায়িত্ব তাঁদের পালন করেই যেতে হবে।

বর্তমান সমস্যাতেও উলামায়ে কেরাম এই দায়িত্বই পালন করে যাচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের খেদমতকে কবুল করুন এবং উম্মতের হেদায়েতের ওসীলা বানিয়ে দিন।

আলিমগণ তো তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন, সাধারণ মুসলমানদেরকেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের দায়িত্ব কী? তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, উলমায়ে কেরামের মেহনত ও কল্যাণকামিতার মূল্যায়ন করা এবং তাদের রাহনুমায়ী অনুসারে হককে অবলম্বন করা।

মনে রাখতে হবে, হক্কানী আলিমগণের রাহনুমায়ী আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নিআমত। এই নিআমতের শোকরগোযারি করা কর্তব্য। কেউ যখন আল্লাহ তাআলার কোনো নিআমতের শোকরগোযারি করে আল্লাহ তাআলা সেই নিআমত আরো বাড়িয়ে দেন। সঠিক পথনির্দেশনারূপ নিআমতের এক বড় শোকরগোযারি হচ্ছে, সেই পথনির্দেশনাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করা এবং সে অনুযায়ী নিজেও চলা, অন্যকেও চলতে উদ্বুদ্ধ করা। আর যাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার এই নিআমত এসেছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং হকের বিস্তার ও প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করা।

হক ও বাতিল চিহ্নিত করে দেওয়ার কাজটি যখন হক্কানী আলিমগণ করে দেন তখন সর্বস্তরের মুসলমানের কর্তব্য হয়ে যায় নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে শরীয়তসম্মত পন্থায় বাতিলকে প্রতিহত করা এবং হককে প্রতিষ্ঠিত করা। শরীয়তের নীতি ও বিধানের ভিতরে থেকে হকের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যা যা উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা যায় তাতে অবহেলা বা শৈথিল্য না করা।

ইজতিমার তারিখ ও আয়োজনের ক্ষেত্রে দুটি তারিখ ও দুটি আয়োজনের কথা শোনা যাচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক বিষয়। সবার কর্তব্য ছিল, বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তির পক্ষ ত্যাগ করে সঠিক পথ ও পন্থার উপর, যা হক্কানী উলামায়ে কেরাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, একমত হয়ে উলামায়ে কেরামের সাথে এক শামিয়ানার নীচে চলে আসা। যারা তা করবেন না নিঃসন্দেহে বিভেদ-বিভক্তির দায় তাদের উপরই বর্তাবে। বাতিলের পথে থেকে বাহ্যিক বিজয়ও প্রকৃত বিজয় নয়। এটা নিঃসন্দেহে পরাজয় এবং চূড়ান্ত পরাজয়ের ভূমিকা। বিচ্যুতি-বিভ্রান্তি সম্পর্কে জেনে-বুঝেও হক্কানী উলামায়ে কেরামের বিরোধিতা করে কোনো ‘ইজতিমা’ যদি করাও হয় সেটি কি সত্যিই দ্বীনী ইজতিমা হবে? কাজেই সকল উগ্রতা ও হঠকারিতার ঊর্ধ্বে উঠে আখিরাতের জবাবদিহিতাকে স্মরণ করুন। আখিরাতের মুক্তি ও সাফল্যের জন্য লালায়িত হোন। আখিরাতে প্রত্যেককে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে। হক্কানী উলামায়ে কেরামের দ্ব্যর্থহীন বর্ণনার পরও গোমরাহীর পথে কেউ থাকলে আখিরাতে তার ওজর-অজুহাতের কোনো সুযোগ থাকবে না।

একারণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের কর্তব্য, হক্কানী উলামায়ে কেরাম যে ইজতিমাকে সমর্থন দেন ঐ ইজতিমাতে শামিল হওয়া এবং ইজতিমার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সফল করার চেষ্টা করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের হককে হক জানার ও তার অনুগামী হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

Leave a Reply