উলামায়ে কিরামের মতভিন্নতা ও জনসাধারণের করণীয় : প্রেক্ষিত তাবলীগ – উমর ফারূক আত তাসলিম

তাবলীগ সংকট ও মতভিন্নতার মূলনীতি

উমর ফারূক আত তাসলিম


(এটা তখনকার লেখা যখন বিতর্ক প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল)

বরাবরই জনসাধারণের মাঝে তুলনামূলক স্বচ্ছ ইমেজ সংরক্ষণকারী তাবলীগ জামাত নিয়ে কিছু সমস্যা ও বিতর্ক তৈরী হয়েছে, এই প্রেক্ষিতে জনসাধারণ কিছুটা হতাশ ও কনফিউজড। অনেকের প্রশ্ন উলামায়ে কেরাম কেন এত মতভেদ করেন? বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে কেন উদার দৃষ্টিভঙ্গি করেননা। যেহেতু আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “তোমরা আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়োনা।”(সূরাহ আল ইমরান:১০৩)
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন “তোমরা বিতর্ক করোনা। তাহলে তোমরা ব্যার্থ হয়ে যাবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে” (সূরাহ আনফাল: ৪৬)
আরো ইরশাদ হয়েছে “তোমার পালনকর্তা যাদের উপর রহমত করেছেন, তারা ব্যতীত সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে(সূরাহ হূদ:১১৮-১১৯)
আল্লাহ তায়ালার এই ধমকি সত্ত্বেও উলামায়ে কেরাম কেন ইখতিলাফ করেন?
উত্তর দেয়ার আগে জেনে রাখা ভালো ইখতিলাফ ভা মতভিন্নতা মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব। দুনিয়াবি হোক কিংবা উখরুবি, প্রতিটি সেক্টরে মতভিন্নতা আছে, বিজ্ঞানীদের একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন থিওরি দিতে দেখা যায়। ডাক্তাররা একই রোগে আলাদা আলাদা ঔষধ দিয়ে থাকেন। নির্বাচনে পুরো জাতি কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সালিশে বিচারকদের মধ্যেও মতভিন্নতা থাকে। আর মতভিন্নতা থাকে বলেই নতুন নতুন পথ সুগম হয়। একে আল্লাহর কুদরতও বলা যেতে পারে। তিনি মানুষের মাঝে এমন সৃষ্টিশীলতা দিয়ে দিয়েছেন যে, একই বিষয়ে তারা ভিন্ন ভিন্ন অভিমতের মাধ্যমে সত্য ও সঠিক বিষয়টির সন্ধান পেয়ে যায়। মানব সৃষ্টির সূচনা থেকেই ইখতিলাফের শুরু। এই ইখতিলাফ যেমন মানবজাতির কল্যাণ সাধন করেছে, একইভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে অনেকবার।

এখন উলামায়ে কেরামের ইখতিলাফকে মন্দ মনে করা হচ্ছে, অথচ
রাসূল সা. এর যুগেও ইখতিলাফ ছিলো।
রাসূল সা. এক যুদ্ধে সাহাবিদের বললেন, তোমদের কেউ যেন বনু কুরায়জায় না গিয়ে আসর না পড়ে। তারা পথ চলতে আরম্ভ করলো, পথিমধ্যে আসরের সময় হয়ে গেলে কতিপয় সাহাবি সেখানেই নামায পড়ে নেন, তারা বলেন রাসূল সা. দ্রুত চলার তাগাদা দেয়ার জন্য এরুপ নির্দেশ দিয়েছেন। অবশিষ্টরা আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী নামায পড়া থেকে বিরত রইলেন। রাসূল সা. কে এই ঘটনা জানানো হলে তিনি কোন পক্ষকেই কিছু বললেননা। (বুখারী ও মুসলিম)
ইখতিলাফকে কেন্দ্র করে সাহাবের মাঝে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে, রাসূল সা. এর জীবদ্দশায়ও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
একদিন রাসূল সা. আবু হুরায়রা রা. কে তার পাদুকা মুবারক আলামত হিসেবে দিয়ে বললেন, এই দেয়ালের ওপাশে যার সাথে দেখা হবে তাকে বলবে, যে ব্যাক্তি নিষ্ঠার সাথে সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তায়ালা এক এবং আমি আল্লাহ তায়ালার রাসূল, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আবু হুরায়রা রা. পাদুকা মুবারক নিয়ে রওনা হলেন, দেয়ালের ওপাশে তার সাথে হজরত উমর ফারূক রা. এর সাক্ষাৎ হয়। আবু হুরায়রা রা. তাকে এই হাদীস শোনালে তিনি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। আবু হুরায়রা কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সা. এর নিকট প্রত্যাবর্তন করেন। পেছন পেছন উমর ফারূক রা.ও আগমন করেন। রাসূল সা. তাকে ধাক্কা দেয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেন, তিনি বলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই হাদীস শুনলে মুসলমানরা আমল করা ছেড়ে দিয়ে শুধু কালিমায়ে শাহাদাতের উপর নির্ভর করে থাকবে। ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিন, রাসূল সা. উমর ফারূক রা. এর আবেদন মনজুর করে নিলেন। (মুসলিম)
অপর এক হাদীসে উল্লেখ আছে, হজরত উমর ফারূক রা. বলেন: আমি হিশাম বিন হাকিম বিন হিযামকে সূরাহ আল ফুরকান সেই নিয়মের চেয়ে ভিন্নভাবে পড়তে দেখলাম, যেভাবে রাসূলুল্লাহ(সা.) আমাকে শিখিয়েছিলেন, আমি তাকে তখনই আটকে দিতে উদ্যত হলাম, কিন্তু (নামায) শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। অত:পর আমি তার চাদর ধরে তাকে রাসূলুল্লাহ(সা.)এঁর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এই ব্যক্তিকে এমন পদ্ধতীতে সূরাহ আল-ফুরকান পড়তে শুনেছি যা আপনি আমাকে যেভাবে শিখিয়েছেন তা অপেক্ষা ভিন্ন। রাসূলুল্লাহ(সা.) তাকে ছেড়ে দিতে বললেন এবং তিলাওয়াত করার আদেশ দিলেন। তিনি সেই পদ্ধতীতে পড়লেন যে পদ্ধতীতে আমি তাকে পড়তে শুনেছিলাম। রাসূলুল্লাহ(সা.) তখন বললেন এভাবেই এটা নাযিল হয়েছে। এরপর আমাকে তিলাওয়াত করতে বললেন, আমি তিলাওয়াত করলাম। তিনি বললেন এভাবেই এটা নাযিল হয়েছে। কুরআন সাতটি হরফে নাযিল হয়েছে। কাজেই সেগুলোর ভেতর হতে যেটা সহজ মনে হয় সেভাবেই তিলাওয়াত করো। (বুখারী ও মুসলিম)
উল্লেখ্য, উমর ফারূক রা. এর এই কঠোরতা দ্বীনী গায়রতের জন্যই ছিলো, ব্যাক্তিগত কোনো আক্রোশে নয়। তার এই কঠোরতা আসলে ছিলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য রহমত। তিনি শক্ত হাতে ফেতনা ফাসাদের স্রোত রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। তার ইন্তিকালের মাধ্যমে ফেতনার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়, যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর বন্ধ হবেনা (তিরমিজি)
ইখতিলাফ ও মতভিন্নতা নতুন কোনো জিনিস নয়। ইহুদি কূটচালের কারণে অনেক সাহাবিরও ইজতিহাদি তাসামুহ হয়ে গিয়েছিলো। ফলশ্রুতিতে সংঘটিত হয় জংগে সিফফিন ও জংগে জামালের মত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সিফফিনের যুদ্ধক্ষত্রে উভয় পক্ষ ৩ মাস ২০ দিন অবস্থান করেছিলেন। এতে পরস্পর ৯০টি সংঘর্ষ হয়েছিল। এ যুদ্ধে আলী রা. এর পক্ষের ২৫ হাজার এবং মুয়াবিয়া রা. এর পক্ষের ৪৫ হাজার মোট ৭০হাজার মুসলমান শাহাদাত বরন করেন। যাদের মধ্যে ৭০ জন বদরি সাহাবিও ছিলেন। উভয় পক্ষ নিজেদের হকপন্থি ভাবতেন, তাই যুদ্ধগুলো ছিলো অত্যন্ত ভয়াবহ। (আল মুনতাজিম ফি তারীখিল মুলূক ওয়াল উমাম)
জামালের যুদ্ধে আয়শা রা. ও আলী রা. উভয় পক্ষের ১০ হাজার লোক নিহত হোন। এতদসত্ত্বেও সিফফীনের সময় দিনে যুদ্ধ হত, আর রাত্রে একদল অন্য দলের শহীদদের দাফন-কাফনে শরীক হতেন। (আল’বিদায়া অন’নিহায়া ৭খ. ২২৭ পৃ.)
একদলের মাসআলার প্রয়োজন হলে লোক পাঠিয়ে অন্য দল থেকে তা জেনে নিতেন। (তারিখুল খোলাফা)
মুনাফিক ও ইহুদী এজেন্ট ছাড়া এ যুদ্ধ সমূহে নিহত প্রতিটি মুসলমানই ইনশাল্লাহ জান্নাতী। তাই ছোট খাটো বিষয়ের ইখতিলাফ নিয়ে যারা উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকে, অথবা দ্বীন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে তারা ইখতিলাফবিহীন কোনো একটি যমানার কোনো একটি সেক্টর অন্তত দেখাক।

তবে সব ইখতিলাফ যেমন নিন্দিত নয়, তেমনি সব ধরণের ইখতিলাফ পছন্দনীয়ও নয়।
নিন্দনীয় মতভিন্নতা: চার শ্রেণীর ইখতিলাফ নিন্দনীয়।

এক: বে-ইলম ব্যাক্তির ইখতিলাফ। বর্তমানে অনেক বেইলম জাহেল লোক কিছু বাংলা বই পড়ে অথবা ইউটিউবে লেকচার শুনে নিজেদের ইখতিলাফের যোগ্য ভাবতে শুরু করে, এমনকি ব্যাক্তিপুজারী কিছু লোক নিজ মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে উলামায়ে কেরামকে লাঞ্চিত করতেও ছাড়েনা। ইলম যদি বই পুস্তকে সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে রাসূল সা. এই কথা বলতেননা “আল্লাহ তায়ালা ইলম বান্দার কাছ থেকে হঠাৎ ছিনিয়ে নিয়ে যাবেন না, বরং আলেমদের ইন্তিকালের মাধ্যমে ইলম ওঠিয়ে নিবেন। তখন জনসাধারণ জাহেলদের নিকট ফতোয়া জিজ্ঞাসা করবে, তারা ভুল ফতোয়া দিয়ে নিজেরাও গোমরাহ হবে, জনসাধারণকেও গোমরাহ করবে।” (বুখারী)
উলামায়ে কেরামের অনুপস্থিতি মানে হলো ইলমের অনুপস্থিতি। নইলে বই পুস্তক ও ইন্টারনেটের জ্ঞান তো সর্বদাই থাকবে।

দুই: পক্ষপাতদুষ্ট ইখতিলাফ
। বেশীরভাগ লোক নিজের দেশ, জাতি, ভাষাভাষী, মাজহাব, দল, অঞ্চল ও খাহেশাতে নফসানীর পক্ষ নিয়ে মতভেদ করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন “যদি তোমাদের মাঝে কোন বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় তাহলে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো। (সূরাহ নিসা: ৫৯)
দুনিয়াবি কাজকর্মে এই সমস্যাটি আরো প্রকট। দেখা যায়, সত্য মিথ্যার পরোয়া না করে এক গ্রামের সাথে আরেক গ্রামের বাসিন্দারা, এক দেশের সাথে আরেক দেশ লড়াই করে। মানুষ আপন লোকদের সাপোর্ট দেয়াকে অগ্রাধিকার দেয় সত্যান্বেষণের চেয়ে। শরঈ আহকামের ক্ষেত্রে এই মানসিকতা সম্পন্ন লোকদের ইখতিলাফ নিন্দনীয় । এই ধরণের ইখতিলাফ মক্কাবাসী প্রাথমিক যুগে নবীজি সা. এর সাথে করেছিলো।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন “আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সে হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেছেন; তখন তারা বলে কিছুতেই না। আমরা তো সে বিষয়েরই অনুসরণ করব- যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদিও তাদের বাপ দাদারা কিছুই জানতো না, জানতো না সরল পথও।”
(সুরা বাকারাহ: ১৭০)
মোটকথা গভীর ইলম ও ন্যায়পরায়ণতা যদি না থাকে তাহলে তার জন্য শরঈ কোন বিষয়ে ইখতিলাফ করা জায়েয হবেনা। চাই তা মুবাহ পর্যায়ের হুকুম হোক না কেন।

তিন: ঈমান ও আকিদা সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়! আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বহু নবী রাসূল প্রেরণ করেছেন, অনেককে দিয়েছেন নতুন নতুন শরীয়ত। তবে সবগুলোর মূল মাকছাদ একই ছিলো, আল্লাহরকে এক জানা ও তার উপর ঈমান আনয়ন করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন “তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।” (সূরাহ শূরা -১৩)
সুতরাং মৌলিক বিষয়াবলীতে ইখতিলাফের কোনো সুযোগ নেই।
হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন একবার রাসূল সা. আমাদের নিকট এসে দেখলেন আমরা তাকদির সম্পর্কে বাদানুবাদ করছি। এটা দেখে গোস্বায় তার চেহারা লালবর্ণ ধারণ করলো, যেন চেহারা মুবারকে আনার নিংড়ে দেয়া হয়েছে। অত:পর তিনি বললেন, এজন্য তোমরা আদিষ্ট হয়েছ? অথবা এজন্য আমাকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে? তোমাদের পূর্বে অনেক জাতি এই বিষয়ে বাদানুবাদ করে ধ্বংস হয়ে গেছে” (তিরমিজি)

চার: সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াত সমূহে ইখতিলাফ: ইখতিলাফের উদ্দেশ্য হলো শুদ্ধ ও সঠিক পথ খুঁজে বের করা। কিন্তু সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াত সমূহের সঠিক উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা মানুষের ক্ষমতা বহির্ভূত কাজ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন “তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ । সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার সাদৃশ্যপূর্ণগুলোর, সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেন আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে।” (সূরাহ আল ইমরান:৭)

একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর;

একেক আলেমের একেক মত। কোনটা ঠিক? অথবা কোনটা মানবো? এই প্রশ্নের উৎস হলো আহলে হাদীসদের সেই বিখ্যাত উক্তি -“যে কোন একটা সঠিক হবে। সবগুলো একসাথে সঠিক হতে পারেনা” তারা সুকৌশলে জনসাধারণের মাথায় এই থিওরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা এ কথার দলীল স্বরুপ নিন্দনীয় ইখতিলাফের আয়াতগুলো উল্লেখ করে থাকে। আমরা বলবো একাধিক মত কিংবা সবগুলো মত সঠিক হতে পারে। (উপরে আমরা কুরআন হাদীস থেকে এর প্রমাণ দিয়েছি।) হজরত উমর বিন আব্দুল আজিজ র. বলেন “সাহাবাদের ইখতিলাফ আমাকে আনন্দিত করে, কারণ এর দ্বারা উম্মতের ইখতিলাফের অনুমতিপত্র পেয়েছে” (জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহী)
তবে যেটা দলীল প্রমাণ দ্বারা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সেটা অনুসরণ করা উত্তম। আর যাদের দলীল প্রমাণ যাচাই করার ক্ষমতা নেই তারা তাদের দৃষ্টিতে হকপন্থী লোকদের তাকলিদ করবে। তবে ভিন্নমতাবলম্বীদের পথভ্রষ্ট বলা যাবেনা।

শাখাগত ইখতিলাফের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে:

শাখাগত ইখতিলাফ নিয়ে স্বাভাবিক আলোচনা হতে পারে, তবে কোন ধরণের কটুবাক্য ব্যাবহার করা যাবেনা। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মজলিসে কখনো কখনো একটি মাসয়ালা নিয়ে কয়েকদিন পর্যন্ত বিতর্ক চলত, কিন্তু কোনো কটুবাক্য ব্যাবহার হতোনা। মনে রাখতে হবে, যখন উম্মতের বৃহত্তর স্বার্থ সম্মুখে আসবে তখন ছোটখাটো ইখতিলাফ গৌণ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। “আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ যখন হালাকু খান আক্রমণ করে তখনও শহরের বিভিন্ন স্থানে বিতর্ক অনুষ্ঠান চলছিলো” (জামেউত তাওয়ারিখ)
কিন্তু তখন বিতর্কের সময় ছিলোনা, ছিলো জিহাদের সময়। ফলে তাতাররা পুরো বাগদাদ ও আব্বাসীয় সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

পছন্দনীয় মতভেদ:

একটি মহল সার্বিকভাবে ইখতিলাফকে হারাম মনে করলেও শরীয়ত এ বিষয়ে ছাড় দিয়েছে। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যাক্তি সঠিক ইজতিহাদ করলো সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে, আর যে ব্যাক্তি ইজতিহাদে ভুল করলো সেও ইজতিহাদের সওয়াব পাবে। (বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীস দ্বারা বোঝা যায় আল্লাহ তায়ালা কিছু কিছু আহকামের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ ও ইখতিলাফকে উৎসাহিত করেছেন।

এক:মুজতাহাদ ফিহী মাসায়েল। যদি কুরআন হাদীসে সুস্পষ্ট নস না থাকে তাহলে এধরণের মাসয়ালায় ইখতিলাফ শরীয়তে পছন্দনীয়। এ জাতীয় ইখতিলাফকে মন্দ বলা অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই নয়। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শাখাগত মাসয়ালায় ইখতিলাফ করা হয়। কখনো কখনো হালাল হারামের ব্যাপারেও ইখতিলাফ হয়; এর সংখ্যা নগণ্য।

দুই: মারজুহ ব্যাখ্যা ও অপব্যাখ্যার জবাব প্রদান: এটা উলামায়ে কেরামের গুরুদায়িত্ব সমূহের মধ্যে একটি। ১৪০০ বছর ধরে বিরোধীদের সকল ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের উত্তর প্রদানপূর্বক দ্বীনকে তার প্রকৃত অবয়বের উপর রেখেছে। সাহাবায়ে আজমাঈন ও আমাদের সালাফ প্রচুর পরিমাণ বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন। হজরত ইবনে আব্বাস রাযি, খারেজি ফেতনার সময় তাদের সাথে বিতর্ক করেছেন (আল ফারকু বাইনার ফিরাক)
এছাড়া ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমদ, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম সহ বড় বড় মুজতাহিদিন, মুহাদ্দিসীনদেরও জীবিনের বড় একটা সময় বিরোধীদের মুকাবিলা করতে হয়েছে।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, উপরুক্ত আলোচনা দ্বারা একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়, তাবলীগ জামাতের মাওলানা সা’দ সাহেবের ভ্রান্তি কোনো ছোটখাটো ভ্রান্তি ছিলোনা। তাই এ সম্পর্কে প্রতিবাদ করে উলামায়ে কেরাম নিজেদের উপর বর্তানো ফরজ আদায় করেছেন। এই ফরজিয়্যত আদায় করতে গিয়ে উলামায়ে কেরামের সাথে যা কিছু ঘটেছে তা অত্যান্ত দু:খজনক।
যেসব ভাই মাওলানা সা’দ সাহেবের রুজুর কথা বলে থাকেন, তাদের হয়ত আমাদের সালাফের রুজু সম্পর্কে ধারণা নেই, তাদের উচিত উলামায়ে কেরামের উপর আস্থা রাখা, কারণ উলামায়ে কেরাম পর্যবেক্ষণ শক্তি তাদের থেকে অনেক উচ্চতর। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, প্রত্যেক মানুষ ভুল করে। আর উত্তম ভুলকারী সেই ব্যাক্তি যে ভুল থেকে প্রত্যাবর্তন করে। (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

সালাফগণের রুজু

সাঈদ ইবনে ইয়াজ রহ. থেকে বর্ণিত, কুফার এক ব্যাক্তি বিয়ে করলো, কিন্তু বিয়ের পর স্ত্রীর মাকে তার বেশী ভালো লেগে যায়। তাই সে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা.এর কাছে জানতে চায় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার মাকে বিয়ে করা জায়েয হবে কিনা? ইবনে মাসঊদ রা. ক্বিয়াস করে বলেন, হ্যাঁ, জায়েয হবে। পরবর্তীতে তিনি মদীনায় গিয়ে অন্যান্য সাহাবাদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন জায়েয হবেনা। সঙ্গে সঙ্গে কুফায় ফিরে এসে সেই ব্যাক্তিকে খুঁজে বের করলেন এবং তাকে জানিয়ে দিলেন এটা হারাম (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক)
হজরত সা’দ বিন ইব্রাহীম রহ. একবার ফতোয়া দেয়ার পর জানতে পারলেন তার ফতোয়া ভুল ছিলো। এরপর তিনি আগের ফতোয়ার কপি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। (মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার লিল বাইহাকি)
ইমাম বুকায়ী রহ. বলতেন কাউকে আমার ভুল সম্পর্কে তিরস্কার করতে দেখলে আমি নিজেকে সংশোধন করে নিতাম। এবং তার জন্য দুয়া করতাম। সর্বত্র তার প্রশংসা করে বেড়াতাম। আল্লাহর কসম! যদি আমার স্বামর্থ থাকত, তাহলে প্রতিটি ভুলের জন্য এক দিনার করে দান করতাম।
ইবনুল জাওযি রহ. বলেন আমাদের সালাফের রীতি ছিলো যদি তারা ভুল কিছু বলে ফেলতেন, তাহলে সেই ভুল সম্পর্কে অবগত করানো ব্যাতিত স্থীর থাকতে পারতেননা
ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ রহ. কে এক লোক মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করলে তিনি ভুল ফতোয়া দিয়ে দেন। কিন্তু লোকটিকে তিনি চিনতেননা। পরবর্তীতে তিনি একজন ঘোষক নিযুক্ত করলেন, এবং ঘোষণা করে দিলেন অমুক দিন কে কে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করেছো তারা সাক্ষাৎ করো। এভাবে বেশ কয়েকদিন ওই এলাকায় অবস্থান করেন। অবশেষে লোকটিকে খুঁজে বের করে ভুল সম্পর্কে অবগত করিয়ে তবে ফিরে আসেন। (তা’জিমুল ফুতইয়া)
এরকম হাজারো ঘটনা রয়েছে। মাওলানা সা’দ সাহেব কী পারতেননা নিয়মানুযায়ী রুজু করে সমস্ত ফেতনা মাটিচাপা দিতে।
(মাওলানা সা’দ সাহেবের রুজু কেন গ্রহণযোগ্য নয় সে সম্পর্কে মাসিক আদর্শ নারীর বিগত সংখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে।)

একটি মারাত্মক ভয়াবহ ব্যাপার

সম্প্রতি কিছু অবুঝ তাবলীগী ভাই কর্তৃক মসজিদ থেকে আলেম উলামাদের বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে (নাউজুবিল্লাহ)
যারা না থাকলে মদজিদগুলো বিরান পড়ে থাকতো তাদেরই মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে? অথচ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন “ঐ ব্যাক্তির চেয়ে বড় জালেম আর কে? যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে বাঁধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে, এদের পক্ষে মসজিদসমূহে প্রবেশ করা বিধেয় নয়, অবশ্য ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায়। ওদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে।” (সূরাহ বাকারা:১১৪)
এমনও দেখা গেছে, স্বপক্ষের না হওয়ায় কুরআন তেলাওয়াত করা অবস্থায় হাত থেকে কুরআন কেড়ে নিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। সাবধান! উলামায়ে ক্বেরাম হলো রাসূল সা. এর ওয়ারিশ। তাদেরকে অপমানিত করার দ্বারা প্রকারান্তরে রাসূল সা. কেই অপমান করা হয়। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে হেদায়েত দান করুন। আমিন

সাম্প্রতিক প্রেক্ষিতে জনসাধারণের করণীয়

(ক) উলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ পূর্বক কদম ফেলা। কেননা আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূল এবং উলূল আমরের ইতাআ’ত করো (সূরাহ নিসা: ৫৯)
হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন উলূল আমর অর্থ হলো ফক্বীহ উলামায়ে কেরাম (তাফসীরে ইবনে কাসির)

(খ) বেশী বেশী ইস্তিগফার পড়া ও আল্লাহ তায়ালার কাছে হেদায়াতের দুয়া করা।
হজরত আব্বাস রা. বলেন, মুসিবত আসে মানুষের গুনাহর কারণে। আর তা ইস্তিগফার ছাড়া দূরীভূত হয়না। (তারীখে দিমাশক লিইবনে আসাকির)

(গ) ধৈর্য, সহনশীলতা ও নম্রতা অবলম্বন করা: আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা ও হারূন আ. কে নির্দেশ দেন “তোমরা উভয়ে ফেরআউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে নাফরমানি করেছে। অতঃপর তোমরা তাকে নম্র কথা বল, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে। (সূরাহ ত্বাহা:৪৩,৪৪)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, তাদের আপন পালনকর্তার পথের প্রতি ডাকুন হেকমত ও সুন্দরভাবে নসীহত করে। এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তন পন্থায়। (সূরাহ নাহল:১২৫)
দ্বীনদার লোকদের প্রতি কঠোরতা করতে বারণ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,
আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। কাজেই আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, তারপর আপনি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবেন; অব্যশই আল্লাহ্ (তাঁর উপর) নির্ভরকারীদের ভালবাসেন। (সূরাহ আলে ইমরান: ১৫৯)

Leave a Reply