edited- ওলামায়ে কেরামকে আপনার প্রতিপক্ষ ভাববেন না -আল্লামা তকী উসমানী

অনুবাদ আব্দুল্লাহ ফারুক


ইসলাম কখনই একমুখী পথে চলতে বলে না। তাবলীগ জামাতের আকাবিরগণের মধ্যে কেউই এমন শিক্ষা দেননি। কিন্তু পরবর্তীকালে কিছু লোকের মাঝে আত্মম্ভরিতা জন্ম নিয়েছে। এরা পড়ালেখা না করেই এবং দ্বীনের গভীর উপলব্ধি আত্মস্থ না করেই আমির বনার স্বপ্ন দেখছে। এরাই দুনিয়াকে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট করছে।
কাজেই তাবলীগের ভাইদেরকে আমি বলব, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করুন। কেউ যদি ইখলাসের সঙ্গে আপনাকে কোনো কথা বলে তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে তাকে আপনার শত্রু মনে করবেন না। তাকে আপনার মুখালিফ বা প্রতিপক্ষ মনে করবেন না।

আমি আগেও বলেছি যে, আল্লাহর মেহেরবানীতে তাবলীগ জামাতের মাধ্যমে উম্মতের যে পরিমাণ উপকার হয়েছে, তা অন্য কোনো জামাতের মাধ্যমে হয়নি। এটি হযরতজি মাওলানা মুহাম্মদ ইলয়াস রহ. এর বুকের আগুন। যেই আগুনের আলোয় সারা দুনিয়াতে একটি সুবিশাল নূর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন, এর অর্থ এই নয় যে, ‘এ জামাতের সকল সদস্য নিষ্পাপ ও ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। তাদের কারো থেকে কোনো বিভ্রান্তি প্রকাশ পেতে পারে না।’ ‘তাদের কারো থেকে কোনো ভুল প্রকাশ পেলে তা ধরিয়ে দেওয়া যাবে না।’ ‘যদি কেউ ভুল ধরিয়ে দেয় তাহলে সে তাবলীগের শত্রু।’ যাদের মাঝে এ ধরনের বিষাক্ত মানসিকতা আছে, তারা যেন অতিসত্বর নিজের মানসিকতা শুদ্ধ করে নেয়। যদি এই মানসিকতা থাকে তাহলে তা আপনাদেরকে একটি ফেরকা বানিয়ে ফেলবে। এই মানসিকতা আপনাদেরকে মুসলিম উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এ ধরনের চিন্তাধারা খতম করুন।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, তারা তাদের সেই মানসিকতাকে নির্মূল করবেন এবং এ জামাতকে ভারসাম্যপূর্ণ পথে উঠিয়ে আনার চেষ্টা করে যাবেন। এটাই তাবলীগের আসল দাওয়াত। হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. এর কাছে যখন আমার আব্বা হযরত মাওলানা মুফতি শফী সাহেব রহ. গেলেন তখন মাওলানা ইলিয়াস রহ. চোখের পানি ফেলে কাঁদতে শুরু করেন। তিনি বললেন, যেভাবে সারা দুনিয়াতে দাওয়াতের মেহনত ছড়িয়ে পড়েছে তা দেখে ভয় হচ্ছে, জামাতের এই অস্বাভাবিক জনপ্রিয়তা ইসতিদরাজ (ধীরে ধীরে পাকড়াও) নয়তো!
তখন আব্বাজান উত্তর দেন, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি যে, এটি ইসতিদরাজ নয়। কারণ হলো, ইসতিদরাজ তখন হয় যখন ব্যক্তির মনে ইসতিদরাজের শঙ্কা না জাগে। আপনার মনের এই শঙ্কা প্রমাণ দিচ্ছে যে, এটি ইসতিদরাজ নয়।
ইলিয়াস রহ. তখন শান্ত হন। এরপর বলেন, ‘আমাদের এই মেহনতের লাগাম ক্রমশ সাধারণ শিক্ষিতদের হাতে চলে যাচ্ছে। কাজেই শঙ্কা জাগছে, এরা বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের শিকার হয়ে পড়তে পারে।

আব্বাজান যেই বাড়াবাড়ি ও আত্মশ্লাঘার কথা বলেছিলেন, এখন তা ক্রমশ পরিলক্ষিত হতে শুরু করেছে। এদের অবস্থা এমন যে, আপনি যতবার অতি সামান্য পরিমাণেও কথা বলতে যান, যত ইখলাসের সঙ্গেই বলুন, যত ভালোবাসা জড়িয়েই বলুন, তারা আপনার কথাকে তাবলীগের বিরোধিতা সাব্যস্ত করবে। তারা তৎক্ষণাৎ মুখের ওপর মন্তব্য করবে যে, এটি তাবলীগের বৈরিতা। আমি অনুরোধ করব, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি নিজেও এই কর্মপন্থা ত্যাগ করুন। অন্যদেরকেও ত্যাগ করতে বলুন।
এখন আমি আপনাদেরকে আমার নিজের এক ঘটনা শোনাচ্ছি। এক মসজিদে আমি প্রতি রোববার কুরআন কারীমের মজলিসে অংশগ্রহণ করে থাকি। মজলিসটি প্রথমে শুক্রবার হতো। সেই মজলিসের উদ্যোগ আমি নিজ থেকে নেইনি। মাওলানা সাহবান মাহমুদ সাহেব সহ আরো কয়েকজন মুরুব্বির উপর্যুপরি অনুরোধে কাজটি শুরু হয়। মজলিস শুরু করার ব্যাপারে যখন সাথীরা এলান করে তখন মহল্লার তাবলীগের সাথীরা এসে বলে যে, মজলিসটি শুক্রবারে করবেন না। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, সেদিন আমাদের গাশত হয়। আমি বললাম, হ্যাঁ, গাশত অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কাজেই আসুন, আমরা সময় আলাদা করে নিই। আপনারা কখন গাশত করেন? তারা উত্তর দিলো, মাগরিব ও ইশার পর।
আমি বললাম, তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। আমাদের বয়ান হবে আসরের পর। আপনাদের মাগরিবের পর।
তখন তারা এর উপর আপত্তি করে বলল, আসল বিষয় হলো, যারা আপনার মজলিসে আসরের পর শরিক হবে তারা আর মাগরিবের পর আমাদের গাশতে আসবে না।
আমি বললাম, ভাই, আমি সবাইকে গাশতে শরিক হতে বলব। উৎসাহ দেব। কাজেই যেহেতু দু’ আমলের সময় এক নয়, কাজেই দুটি আয়োজনের মাঝে বৈপরীত্য হচ্ছে না।
আমি এ কথাটি বলা মাত্রই তাদের মুখ থেকে প্রচণ্ড ঝাঁজ নিয়ে এ বাক্য বের হলো যে, ‘আপনি দ্বীনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।’ দেখুন, তাদের মানসিকতা কী হয়ে গেছে। তারা মনে করছে যে, স্রেফ গাশতই দ্বীনের কাজ। কুরআন কারীমের আলোচনা করা ও শোনানো তাদের কাছে দ্বীনের কাজ নয়। মনে রাখবেন, এটাই সেই গুলু ও বাড়াবাড়ি, যা তাদেরকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়; আপনি যদি তাদেরকে তাদের সেই ভুল ধরিয়ে দিতে যান তাহলে তারা বলবে, এটা তাবলীগের বিরোধিতা। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আপনাদের এই মানসিকতা পরিবর্তন করুন। এই মানসিকতা মেহনতের মাঝে আগুন লাগিয়ে দেবে। এটা মেহনতের প্রচণ্ড ক্ষতি করবে। এই মানসিকতা দ্বীনের কোনো উপকার বয়ে আনবে না।

কিছু লোকের মানসিকতা এতোটাই বিনষ্ট হয়ে গেছে যে, শুধু এই মেহনতই দ্বীনের কাজ। অন্য কোনো আমল দ্বীনের কাজ নয়। সেগুলোর দু’ পয়সার মূল্যও নেই। এটাই বাড়াবাড়ি। এমন অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি থেকে আল্লাহ আমাদের নিরাপদ রাখুন। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি- দুটো থেকেই আল্লাহ আমাদের নিরাপদ রাখুন।
শেষ কথা, আলহামদুলিল্লাহ এই তাবলীগের মেহনত সমষ্টিগতভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমরা যথাসম্ভব বেশি বেশি করে এই মেহনতে সময় লাগানোর চেষ্টা করি। আমাদের নিজেদেরও উপকার হবে, উম্মতেরও উপকার হবে। আমরা অবশ্যই তাবলীগের মেহনত করব এবং উপরে আলোচিত মানসিকতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবৃত্ত রাখব। আমরা সবর করব। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে আমল করব। নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করব না। এই কাজ আসান হয় আল্লাহওয়ালাদের সংস্পর্শের বদৌলতে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সহিহ সুরতে নেক কাজ করার তাওফিক দিন। আমীন

Leave a Reply