edited-তাবলীগের সেকাল-একাল-সাঈদ আল হাসান

সাঈদ আল হাসান
নির্বাহী সম্পাদক


তাবলীগ আরবি শব্দ। অর্থ- পৌঁছে দেয়া, ছড়িয়ে দেয়া বা প্রচার-প্রসার করা। তাবলীগ জামাত মানে প্রচারক দল।
পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলা বিশ্ব মানবতার কল্যাণে নবীজী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে যে দ্বীন-ইসলাম প্রবর্তন করেছেন, এর যথাযথ প্রচার-প্রসার করার নামই হচ্ছে তাবলীগ। যেমন আল্লাহ্‌ তাআলা ইরশাদ করেন:

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥ ۚ
হে রাসূল! আপনার নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে আপনি তা তাবলীগ করুন। আর যদি তা তাবলীগ না করেন, তাহলে তো আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করলেন না। (সূরা মায়েদাহ্ আয়াত : ৬৭)

তাবলীগ জামাতের শুভ সূচনা
বলাবাহুল্য, তাবলীগ বা দ্বীনের প্রচার-প্রসার ইসলামের একটি অন্যতম ফরয বিষয়। দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করা যেমন ফরয, তেমনি সেই জ্ঞান অনুযায়ী যথাসাধ্য ইসলামের দাওয়াত প্রদান, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করাও ফরয। প্রতিটি যুগেই মুসলিম মনীষীগণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সেই ফরয কাজ আঞ্জাম দিয়ে এসেছেন এবং এই কাজগুলির জোয়ার বলবৎ ও বহাল রাখার ব্যবস্থাও করে গেছেন। কিন্তু ব্রিটিশ বেনিয়াদের অপতৎপরতা ও অপকৌশলের কারণে সেই জোয়ারে লেগে যায় ভাটার টান। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে দাওয়াত ও তাবলীগ। উপর্যুপুরি বদদ্বীনি সয়লাব ও টর্নেডোর আঘাতে মুসলমানদের আমল-আখলাক, নীতি-নৈতিকতা, মানবতা ও উদারতা তথা সকল উত্তম গুণাবলি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ে। মুসলিম প্রজন্ম আল্লাহ ও রাসূলকে বেমালুম ভুলতে বসে। ঠিক তখনই উপমহাদেশের বিদগ্ধ দায়ী ও মনীষীগণ দাওয়াত ও তাবলীগের মিশন পুনরায় চালু করবার উদ্দেশে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাদের অন্যতম ছিলেন প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন, আশেকে রাসূল হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ. (১৮৮৫-১৯৪৪)। তিনি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের রাজস্থানের মেওয়াত নামক এলাকায় সর্বপ্রথম তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। অতঃপর ১৯২০ সালে দিল্লিতে তার হাত ধরেই তাবলীগের কর্মতৎপরতা বিস্তৃতি লাভ করে।

পঞ্চাশের দশকে মাও. আব্দুল আজিজের প্রচেষ্টায় ঢাকা ও এর আশপাশে তাবলীগের কার্যক্রম আরম্ভ হয়। অতঃপর তা সারাদেশে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি ভারত উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের প্রায় সকল দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
তাবলীগী কার্যক্রম সূচনার পর থেকে এর নেতৃত্ব প্রদান করেন- প্রতিষ্ঠাতা ওলীয়ে কামেল হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.। ১৯৪৪ সালে তিনি ওফাত লাভ করলে তাবলীগ জামাতের হাল ধরেন তারই পুত্র, বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ, মাওলানা ইউসুফ রহ.। সে সময়ে শায়খুল হাদীস মাওলানা জাকারিয়া রহ. তাবলীগ সাথীদের পাঠ্য হিসেবে ‘তাবলীগী নেসাব’সহ বহু গ্রন্থ রচনা করেন। মাওলানা ইউসুফ রহ. ও শায়খুল হাদীস জাকারিয়া রহ.-এর ইন্তেকালের পর বিশ্ব তাবলীগ জামাতের জিম্মাদার নির্বাচিত হন মাওলানা এনামুল হাসান রহ.।

তাবলীগের গুরুত্ব ও ফজিলত

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিৎ, যারা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে, আর সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করবে। তারাই হলো সফলকাম।’ (আলে ইমরান- ১০৪)। এভাবে দ্বীনের পথে দাওয়াত দানকারীদের অনুপ্রাণিত করে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘সে ব্যক্তির চেয়ে উত্তম আর কার কথা হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয় এবং নিজেও সৎকাজ করে। (হা-মীম সিজদাহ্-৩৩)
সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেছেন, ‘দাওয়াত ও তাবলীগ ইসলামের প্রাণশক্তি। এ চেতনাব্যঞ্জক কর্মতত্পরতা যদি মুসলিম সমাজে লোপ পায় তাহলে মানুষ পশুত্বের পর্যায়ে নেমে আসতে বাধ্য হবে।’ দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ রাসূল সা. এর দায়িত্ব ছিল এবং নায়েবে নবী হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত এ কাজ চালিয়ে যাওয়া সমস্ত ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। কারণ, দাওয়াত ও তাবলীগ না থাকলে ইসলাম চলমান থাকবে না। ইসলাম না থাকলে নবুওত ও রেসালাতও চলমান থাকবে না। এজন্য, আল্লাহ তার মাহবুবকে শেষ নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন, ফলে কেয়ামত পর্যন্ত নবীওয়ালা এই কাজ উম্মতের ওপর অর্পিত হয়েছে। কোনো কালে যদি তা বন্ধ হয়ে যায় ইসলাম ও শরিয়ত বন্ধ হয়ে যাবে। মৌলিক ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ যুগযুগ ধরে চলে আসছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে।

বর্তমান তাবলীগ

হজরতজি ইলয়াস রহ. দারুল উলুম দেওবন্দের কৃতি সন্তান। তিনি যুগযুগ ধরে চলে আসা দাওয়াত ও তাবলীগকে আরো সম্প্রসারণ করে বিশেষ কিছু পদ্ধতিতে নতুন আঙ্গিকে শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তাবলীগের যে নেযাম চলছে, তিনিই ব্যাপক আকারে সুশৃঙ্খলভাবে অধিক ফলপ্রসূ আকারে তা আরম্ভ করেছিলেন। এরপর তার সুযোগ্য সাহেবজাদা হযরত ইউসুফ রহ., এরপর মাওলানা এনামুল হাসান রহ., এরপর যোবায়ের হাসান রহ. সবাই সুন্দরভাবে এই নবীওয়ালা কাজ আঞ্জাম দিয়ে এসেছেন। তাদের পরিচালনায় দাওয়াত ও তাবলীগ এ পর্যন্ত এসেছে। অন্যভাবে বললে, খতমে নবুয়তের ধারাবাহিকতা দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। সেই মহান কাজটাকেই নতুন আঙ্গিকে সুন্দরভাবে ইলয়াস রহ. উম্মতের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এটা নতুন কোন কিছু না বরং আগে থেকেই চালু থাকা জিনিসটাকে পরিমার্জন করে একটা নিয়মের আওতায় আনা হয়েছে।

ইলয়াস রহ. এর আমল থেকে এনামুল হাসান রহ. পর্যন্ত আমিরের পদ্ধতিতে তাবলীগ পরিচালিত হয়ে এসেছে। আহলে ইলম এবং বুযুর্গরা তাদের নিজ প্রয়োজনে আমির বানিয়েছেন। তবে, তারা আমির হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে কখনো আমির দাবি করেন নি এবং পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নি। হযরত এনামুল হাসান রহ.-এর ইন্তেকালের এক কিংবা দেড় বছর আগ পর্যন্ত এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই তাবলীগ জামাত পরিচালিত হয়ে আসছিল।

এনামুল হাসান রহ. ইন্তেকালের পূর্বে চিন্তা করলেন, আমি দুর্বল হয়ে গেছি। এই আলমী কাজ আমার একার দ্বারা আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব না। তাই তিনি ৯ সদস্যের একটি শূরা গঠন করে যান। যতদূর জানা যায়, এনামুল হাসান রহ.-এর পর থেকে মাওলানা যুবাইরুল হাসান রহ.-এর ইন্তিকাল পর্যন্ত এভাবেই তাবলীগ পরিচালিত হয়ে আসছিল।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে তাবলীগের সাথীদের মধ্যে যে শূরার কথা জানা যায় সেটার উৎপত্তি এভাবে- এনামুল হাসান সাহেবের যে ৯ জনের শূরা ছিল তার মধ্য থেকে অনেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার কারণে পাকিস্তানের রায়বেন্ডের ইজতেমায় তাবলীগের মুরুব্বিরা বারবার বলছিলেন ঐ শূন্যস্থানগুলো পূরণ করার জন্য নতুন একটি শূরা গঠন করা হোক।

মুরব্বিগণ কর্তৃক বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও মাওলানা সাদ সাহেব কোনভাবেই এই শূরা গঠন করতে সম্মত হন নি। বরং আমির হতে চাইছিলেন। তিনি রাজি না হওয়াতে পাকিস্তানের ইজতেমায় বিশ্বের সবাই একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন সাদ সাহেব যেহেতু আকাবিরদের পন্থা থেকে সরে গিয়ে তাবলীগের মধ্যে ভিন্নতা ও নতুনত্ব সৃষ্টি করছেন, ফাযায়েলে আমল বাদ দিয়ে ইন্তিখাবে হাদীস চালু করেছেন, আবার বক্তব্যও দেন কুরআন সুন্নাহ বিরোধী, কাজেই এসব থেকে তাকে বের করবার উদ্যোগ নিতে হবে।

এরপর সাদ সাহেবের সাথে একাকী বসে বা লেখনীর মাধ্যমসহ আরো বিভিন্ন পন্থায় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, দ্বীন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য ও ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। আপনি আল্লাহর ওয়াস্তে একটা শূরা গঠন করেন। শূরার মাধ্যমে আপনি যদি কাজ করেন তাহলে এই বিপদ থেকে বেঁচে যাবেন। তবুও মাওলানা সাদ না মানার কারণে ইখতেলাফ যখন তীব্র আকার ধারণ করল, তখন ২০১৫ সালের ইজতেমায় উক্ত কারণেই থেকে সবাই শূরা গঠনের উদ্যোগী হন। তাবলীগের তৎকালীন জিম্মাদার হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব রহ. ইস্তেখারা করে ১৩ জনের একটা শূরা কায়েম করেন এবং বিশ্বের সকল মুরুব্বিকে একসাথে করে সর্বসম্মত স্বাক্ষর নেন।

Leave a Reply