edited- দুজনের সাক্ষাৎকার – গাজী শরফুদ্দিন বুরহানী

তারা মূলত আমাদেরকে মারার জন্য অস্ত্র সহ মাঠে এসেছিল
হেদায়াতুল্লাহ বিন হাবিব, জামিউল উলুম মিরপুর ১৪
সাক্ষাৎকার : গাজী শরফুদ্দিন বুরহানী।

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ইজতেমার কাজের জন্য আমরা মাঠে গিয়েছিলাম বুধবার। উস্তাদদের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসার পর আমরা স্বেচ্ছায় নাম লেখাই এবং বৃহস্পতিবার আবার মাদ্রাসায় ফিরে আসি। তারপর আবার ইজতেমার মাঠে যাই। মুরব্বিদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তক্রমে শনিবার আমরা মাঠে অবস্থান করছিলাম। তখন আমি কামার পাড়া ব্রিজের নিচে টিনের বেড়ার ওখানে ছিলাম। সকাল থেকেই সাদপন্থীরা বাইরে অবস্থান করছিল এবং বিভিন্ন উত্তেজনা মূলক বক্তব্য প্রদান করছিল। ছাত্রদের বিভিন্ন কথা বলে বিভ্রান্ত করছিল। হঠাৎ বাইরে থেকে তারা ইট মারা শুরু করলে আমরাও ভিতর থেকে পাল্টা ইট মারা শুরু করলাম। গেটটা যেহেতু খুব মজবুত ছিল না তাই গেট সুরক্ষায় আমরা গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। বাইরে থেকে একজন আমার মাথায় টার্গেট করে  ইট দিয়ে আঘাত করে, যার ফলে আমার মাথা ফেটে সাথে সাথে রক্ত ঝরতে থাকে। তখন আমার মাথা ঘুরতে শুরু করে ফলে আর সামনে আগাতে পারিনি। অজ্ঞান হয়ে পড়ি।

আমাকে কয়েকজন মিলে একটি কামরায় নিয়ে যায়। যেখানে আমার মতো আরো অনেক ছাত্র আহত অবস্থায় ছিল। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা চলছিল। সাদ বাহিনী মাঠের ভিতর তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম শেষ করে সেই কামরার দিকে আসে এবং গেট খুলতে বলে কিন্তু আমরা ভিতরে আল্লাহ আল্লাহ করছিলাম। গেট খুলিনি। তারা ভারী অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে গেট ভেঙ্গে ফেললো কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করল না এবং আমাদেরকে বললো- তোমরা আমাদের ভাই। তোমাদের কিছু হবে না, তোমরা বাহিরে এসো। বাহিরে যেতেই দেখি দুই পাশে দুই লাইন করে সারিবদ্ধভাবে লাঠি নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে আছে আর বলছে- কান ধরে তাড়াতাড়ি দৌড় দে! আমার পিছনে কজন মুরুব্বী ছিল। জানিনা তাদের কী অবস্থা হয়েছে। আমি দৌড় দিতেই তারা আমাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল এবং আমাকে মেরে রক্তাক্ত করে শুইয়ে ফেললো। এরপর আর যাওয়ার কোনো পথ পাচ্ছিলাম না। পৃথিবীটাকে অন্ধকার মনে হচ্ছিল। তারা বললো দেয়াল টপকা! দেয়াল টপকে দেখি সামনে কাদা। তবুও লাফ দেই এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় আমি সেখান থেকে বের হয়ে আসি। আমার মাথায় পাঁচটা সেলাই পড়েছে ও বিভিন্ন জায়গায় হাড্ডি ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। আমি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছি যে মাঠের মাঝখানে তারা ভারী অস্ত্র নিয়ে আমাদের মাথায় আঘাত করেছে। তারা মূলত তাবলীগের জন্য আসেনি এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি- তারা আমাদেরকে যে  নির্মমভাবে পশুর মত আঘাত করেছে এটা কোন সভ্য সমাজের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা যা করেছে এটা মনুষ্যত্বকেও হার মানায়।



ওরা আমাকে রক্তাক্ত করে তুরাগ নদীতে নিক্ষেপ করেছিলো
মোহাম্মদ নোমান আহমদ। জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর।
সাক্ষাৎকার গাজী শরফুদ্দিন বুরহানী।

আমি আমার ছাত্র ভাইদের সাথে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই মাঠে অবস্থান করছিলাম। শুক্রবার রাতে মুরব্বীদের সিদ্ধান্তক্রমে শনিবার সকাল থেকে সাবান গেটের পাশে অবস্থান নিয়েছিলাম আমরা। ১১ টার দিকে ওখানকার ভেতরগত কিছু মুনাফিক আমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ শুরু করে। আমি তখনও জানতাম না তারা গেট ভেঙে প্রবেশ করেছে। গেটের দিকে রওনা হতে গিয়ে দেখি লাঠিসোঁটা নিয়ে হিংস্রের মতো একদল মানুষরূপী পশু দৌড়ে আসছে। তখন আমি দৌড়ে গিয়ে নিকটের মাদ্রাসায় অবস্থান নিলাম। মাদ্রাসায় অনেক ছাত্র ও উস্তাদ উপস্থিত ছিলেন। সবাই কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সাদ বাহিনী বাহির থেকে বারবার চিৎকার করে বলছিল- বের হয়ে আয়! দরজা খোল!! কিছুক্ষণ পর তারা আশপাশের সকল জানালা এবং  কাঁচগুলো ভেঙ্গে ফেললো। একপর্যায়ে তারা গেট ভেঙে প্রবেশ করে নির্মম পশুর মত আঘাত করা শুরু করলো অর্থাৎ চারপাশে দাঁড়িয়ে মাঝখানে আবদ্ধ করে তারা পেটাতে থাকল। এভাবে কেউ হয়তো পায়ের নিচে পড়েছে, কেউ হয়তো আবার শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। পাশে এক ভাঙ্গা গেট পেয়ে আমরা কজন প্রাণ হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। ভিতরে যারা ছিল, তাদের পরিণতি কী হয়েছে জানিনা। বের হয়েই দ্রুত কাছের এক নতুন একটা বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নিতে চাইলাম কিন্তু সাদ বাহিনী সেখানেও আশ্রয় দেয়নি আমাদের।

তখন কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এতোটুকুই মনে হচ্ছিলো যে, হয়তো আর বেঁচে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি বাঁচার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে দেখতে পেলাম এক সুবিশাল দেওয়াল। ধারালো তারকাটা দিয়ে কভার করা। অন্য উপায় না দেখে আল্লাহর নামে দেয়াল টপকালাম। পরিণতিতে তারকাটা আমার পায়ে বিঁধে গেল। দেয়াল টপকে দেখি ক’জন সন্ত্রাসী একজন ছাত্রকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ঘাড় কেটে দিয়েছে। ভাইটি তখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তবুও তার প্রতি মানুষ রুপি জানোয়ারদের একটুও দয়া হচ্ছে না। আহহহহ!!এখন তো আমার পালা। ক’জন মিলে আমার গলা চিপে ধরে বলল- ‘বল সাদ সাহেব আমীর’। জান বাঁচানো ফরজ। আমি জীবন রক্ষায় হাত নেড়ে সম্মতি জানালাম। অন্তর থেকে নয়। এরপর শুরু হল বেধড়ক প্রহার। মেরে অজ্ঞান করে দুজন মিলে আমাকে তুরাগ নদীতে নিক্ষেপ করলো। মুখ দিয়ে খিস্তি আওড়াচ্ছিল তারা। আর বলছিল যা, তাড়াতাড়ি ভাগ! বলেই ইট মারতে শুরু করলো। তখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিলাম। আমার তো বাঁচার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এভাবে এত কষ্টে মৃত্যু কিভাবে সহ্য করবো? পারছিনা সাতার কাটতে। সারা দেহ রক্তাক্ত। উপর্যুপরি আঘাতে শরীর জর্জরিত।

হঠাৎ ওপার থেকে এক রিকশাওয়ালা তার রিকশা রেখে দ্রুত অল্প সময়ের ভিতর সাঁতার কেটে আমার কাছে এসে আমাকে তাঁর ঘাড়ে তুলে নিয়ে অন্য পাড়ে পৌঁছে দিলেন। তারপরে কয়েক ঘণ্টা কি হয়েছে আমি জানিনা। তবে শুনেছি- আমাকে নিকটবর্তী এক মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে আমাকে হসপিটালে নেয়া হয়। জ্ঞান ফেরার পর মাদ্রাসার ওস্তাদ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তোমার সাথে আহত আর কেউ ছিল সেখানে? আমি বললাম, একজন রক্তাক্ত ছাত্র ছিল। তিনি গোয়েন্দা বাহিনীর একজনকে ফোন দিয়ে বললেন ওখানে কেউ আছে কিনা খোঁজ নিতে। পরে জানা গেল তুরাগ নদীর পাড়ে একজন রক্তাক্ত ছাত্র পড়ে আছে। যেখান থেকে আমাকে নদীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে আমি লালমাটিয়ায় ফিরে আসি। এখন আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ এবং রহমতে ভালো আছি।

Leave a Reply