edited -পরিশুদ্ধির দুটি জায়গা – রুহুল আমীন সাদী

 

ইমাম গাজ্জালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধির কেন্দ্র হচ্ছে দুটি। এই দুটি জায়গায় পরিশুদ্ধি আনতে পারলেই সফলতা আসবে। তার একটা হচ্ছে দেমাগ আর অপরটি হচ্ছে কলব। অর্থাৎ চিন্তায় পরিশুদ্ধি আনতে হবে। একই সাথে অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জন করতে হবে।

আরো সহজ ভাষায় যদি বলি তাহলে বলতে হয়, চিন্তার পরিশুদ্ধি এবং আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন করা ছাড়া একজন মানুষ পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ হতে পারে না।

দাওয়াত এবং তাবলীগ এটা এমন একটি মোবারক মেহনতের নাম যেখানে গেলে একজন বেনামাজি মানুষ নামাজি হয়ে যায়, একজন খারাপ চরিত্রের লোক ভালো চরিত্রের অধিকারী হয়ে যায়, তাবলীগের সময় লাগানোর পর তার চেহারা সুরতে পরিবর্তন আসে, মুখে দাড়ি শোভা পায়, মাথায় সুন্দর টুপি, পরনে সুন্নতি লেবাস আমরা দেখতে পাই। এসব হচ্ছে কলবের তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি অর্জন-এর একটি আলামত।

আমরা অবশ্য ভিন্ন আরেকটি চিত্র সচরাচর দেখতে পাই। তা হচ্ছে, ইসলামের জন্য ডেডিকেটেড, প্রাণ দিতে উৎসর্গীকৃত মানুষজনকে এমনও দেখি যিনি ‘ইসলাম কমপ্লিট কোড অফ লাইফ, একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা’ এই বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান রাখেন, অথচ এমন ব্যক্তিও নামাজে অবহেলা করেন, দাড়ি রাখতে লজ্জাবোধ করেন, কখনো এমন হয় যে লম্বা বয়ান করতে পারেন ইসলামের বিভিন্ন ব্যাপারে, কিন্তু চেহারা সুরতে ইসলাম মানতে প্রবলেম ফিল করেন।
তার দৈনন্দিন চলাফেরায় ইসলামী মূল্যবোধ সেভাবে ফুটে উঠে না।

এমনকি ইসলামী বিপ্লবের জন্য মিছিল করেন, মিটিং করেন, দিনরাত কাজ করেন, কিন্তু সেই ব্যক্তিটিই ইসলামী অনুশাসন ব্যক্তিগত জীবনে পালন করতে অবহেলা করেন।

এর কারণ হচ্ছে তিনি দেমাগের তাযকিয়া বা চিন্তার পরিশুদ্ধি অর্জন করতে পারলেও কলবের পরিশুদ্ধি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ এ দুয়ের পরিশুদ্ধি অর্জন ছাড়া পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

নবী রাসুলগণ আ. যারা পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রধান কাজগুলো কি ছিল তা পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুন্দর ভাবে বলেছেন। তিনি বলেছেন নবী-রাসুলদের কাজ হচ্ছে মূলত চারটা। তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করবেন, মানুষকে পরিশুদ্ধ করবেন এবং কিতাব ও হিকমত এর প্রশিক্ষণ দিবেন। এখানে আমরা নবী আলাইহিমুস সালামদেরকে তাদের কাজের মধ্যে একটি কাজ পাই যার নাম হচ্ছে তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধি।

সাম্প্রতিক সময়ে তাবলীগ জামাতকে কেন্দ্র করে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং এই সমস্যার মূলে আছে তাবলীগ জামাতের আমির জনাব সাদ কান্ধলভী সাহেবের কিছু বিতর্কিত বক্তব্য।

কথা হচ্ছে যার যে কাজ তিনি সেই কাজ না করে যদি অন্য কাজ করতে শুরু করেন তাহলে ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি। জনাব সাদ সাহেবের কাজ ছিল দাওয়াত ও তাবলীগ নিয়ে কথা বলা, কিভাবে দাওয়াত ও তাবলীগ সফল এবং সুন্দর করা যায় তা নিয়ে কথা বলা, কিভাবে একজন মানুষ পার্সোনাল লাইফে সুখী হতে পারে তা নিয়ে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলা। কিন্তু তিনি যখনই এসব বিষয় বাদ দিয়ে অন্যান্য বিষয়ে ডাইরেক্ট ফতোয়া দেয়া শুরু করলেন তখনই সমস্যা তৈরি হল (যার দৃষ্টান্ত ইতোপূর্বে আমরা ডাক্তার জাকির নায়েকের ক্ষেত্রেও দেখেছি) এবং এই সমস্যা এত প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, যে তাবলীগ জামাত জীবনেও কখনো সংঘর্ষে লিপ্ত হবে এমন চিন্তাও করা হয়নি সেই তাবলীগ জামাতেই তুমুল মারামারি হয়েছে, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে এবং এইসব মারামারি নরমাল কোনো মারামারি না, মানুষ মারা গিয়েছে, আহত হয়েছে হাজার হাজার লোক।

এবং এখানে কে কাকে মেরেছে, কে শত্রু কে মিত্র এ বিষয়টা বুঝতেও দেশবাসীর কষ্ট হয়েছে। কারণ দেখা গেছে একই চেহারার একই লেবাসের একদল আরেক দলের উপর কি প্রবল জিঘাংসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

এটা কেন হল, যারা কোন দিন মিছিলেও যাননি হাঙ্গামা অনেক দূরের কথা তারা কেন পাশবিক জিঘাংসায় একদল আরেক দলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন? কে তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করল? কোন যুক্তিতে তারা তাদের ভাইকে মেরে ফেলতে উদ্যত হলেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে যে রেজাল্ট বেরিয়ে আসে যে, তাবলীগ জামাতে মানুষকে নামাজ পড়ার জন্য, দীনের জন্য, আমলের জন্য, সালাম করার জন্য, দুরুদ শরীফ পাঠ করার জন্য, নামাজ বেশি পড়ার জন্য যেভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তেমনি ইসলামের যে অন্যতম থিওরি আল্লাহর হক এবং বান্দার হক এই বিষয়ে ক্লিয়ার কোন আইডিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা তাবলীগ জামাত ছিল না। এখানে ছিল না প্রতিবেশীর হক, মা বাবার হক, সন্তান-সন্ততিকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার হক ইত্যাদি।

ফলে একজন নামাজি পাগড়ী পড়া দাড়িওয়ালা মানুষ তিনি মূলত না বুঝেই আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা মূলক মনোভাব পোষণ করেছেন। কারণ উনার পিছনে কলবের তাযকিয়ার জন্য চেষ্টা করা হলেও দেমাগ বা চিন্তার পরিশুদ্ধির জন্য কোনরকম মেহনত করা হয়নি।

আমরা এমন ও দেখেছি যে তিন চিল্লার সাথী হয়েও তিনি ইলেকশনে ভোট দিচ্ছেন ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শক্তিকে অথচ তিনি ইসলামী দলের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন না।

কারণ, ওই একটাই। আত্মার পরিশুদ্ধি এবং চিন্তার পরিশুদ্ধি। এ দুয়ের মধ্যে ব্যালেন্স হচ্ছে না অথবা কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়ে গেছে।

আমরা চাইব যারা মাঠে ময়দানে দীনের কাজ করছেন, মানুষকে দীন বুঝাচ্ছেন, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা এই কথার দাওয়াত নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন, তারা নিজেদের কলবের পরিশুদ্ধির জন্য কোন ইসলাহী মুরব্বীর সাথে তায়াল্লুক রাখবেন অথবা তাবলীগ জামাতে সময় দিবেন।

আবার যারা তাবলীগ জামাতে সক্রিয় আছেন তারা ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্রে কায়েম করার সংগ্রামে যারা নিয়োজিত আছেন তাদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করবেন।

আত্মার পরিশুদ্ধি ও চিন্তার পরিশুদ্ধি এ দুয়ের সমন্বয় ব্যতীত ব্যক্তি জীবনে অথবা সামাজিক জীবনে ইসলাম কায়েম করা সম্ভব না। ইসলামকে মানতে হলে পরিপূর্ণভাবে মানতে হবে। আংশিকভাবে নয়।

Leave a Reply