পীর-দরবার, ওয়ায়েজ-আলেম, অশান্ত তাবলিগ, দায়ী’র আকালে দেশ– বাদ

আলী আবদুল মুনতাকিম


 

‘আমরা সবাই পাপি, আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের- পাপ মাপি।’ অর্থাৎ আমার পাপের চশমা দিয়ে আমি অন্যকেও পাপি দেখি।

জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কবিতা মনে রেখে চলুন কিছু আলোকপাত করি।

কোন পীর-দরবার-মুরীদ কে, বা কোন মাওলানা-আলেম- ওয়ায়েজিন কে বা কোন ওজাহাতি-এতায়াতি-সাথী ভাই কে সমালোচনা করা, ছোট করা বা নিন্দা করার জন্য আমার এই লেখা নয়, মনের কিছু কষ্টকর অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করব। আপনারা উপকৃত হলে আমার লেখা স্বার্থক হবে।

বাঙালি মুসলমানরা দিনে দিনে আমরা হাসির পাত্র হয়ে যাচ্ছি। লেখাটি দীর্ঘ হলেও মজা পাবেন।অন্তত ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটবে না। ছাত্র ভাইরা নোট করে রাখতে পারেন।

সেদিন দেখলাম, জৈনপুরের আওলাদ মাওলানা ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসি এক ওয়াজে বললেন, এদেশে লক্ষ কোটি মুসলমান হয়েছে জৈনপুরী-ফুরফুরা পীর সাহেবদের কারণে, তাদের বাদ দিলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকে না।

কথাটি আমি বুঝতে পারিনি। কথাটি আংশিক সত্য, পুরো নয়। শাহজালাল রহ., শাহ আমানত, শাহ পরান, দেওবন্দ, তাবলীগের কি কোনো অবদান নেই? অন্য কোন মাহফিলে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করবেন আশা করি। তার কোনো মুরিদ আওয়ার ইসলামের এ লেখাটি পড়লে দয়া করে মেসেজটি দেবেন।

জৈনপুর, ফুরফুরা, শর্ষীনা, শাহ আমানত, মাইজভান্ডারী, বার আউলিয়া, শাহজালাল, শাহপরান, চরমোনাই, আটরশি, শাহ আলী, খান জাহান আলী, দারুস সালাম, আড়াইবাড়ী, ধামতি, সোনাকান্দা ইত্যাদি বহু পীরের দরবার আছে। মোটামোটি বিখ্যাত। কোনোগুলো মৃত পীরের মাজার কেন্দিক, কোনোটা জীবিত পীর কেন্দ্রীক, কোনোগুলো মাদরাসা সমৃদ্ধ দরবার।

মাদরাসাসমৃদ্ধ দরবারগুলো ইসলাম প্রচার ও প্রসারে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে বলা যায়। তারা হাজার হাজার আলেম-মুহাদ্দিস-মুজতাহিদ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে ৷ যেমন, শর্শীনা মাদরাসা, চরমোনাই মাদরাসা, ধামতি মাদরাসা, হাটহাজারী মাদরাসা, আড়াইবাড়ী মাদরাসা, রাহমানিয়া মাদরাসা- এভাবে খুলনা, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় বেশ কিছু মাদরাসা আছে। যদিও তাদের বিভিন্ন সিলসিলায় বিভক্ত করে রাখা হয়েছে।

কিন্তু মাজার কেন্দ্রীক দরবারগুলোতে নানারকম অনিয়ম আর অনাচার লক্ষণীয়। শত দরবারের নাম আমার কাছে আছে, তাদের বহু অনৈসলামিক, কুফরি, শরিয়তবিরোধী কর্মকান্ডের কথাও জানি। এগুলো যেন ইসলামের কাটা। কিন্তু বলার কেউ নেই। আমার মনে হয় এখানে কওমি আলেমদের ভূমিকা রাখার অনেক সু্যোগ ছিল। কিন্তু তারা দায়িত্বটি পালন করছেন না। মাহফিলের বক্তৃতায় তাদের তুলোধুনো করছেন।

হাটহাজারী মাদরাসা বা লালবাগ মাদরাসা বা শর্শীনা মাদরাসা বা চরমোনাই মাদরাসা থেকে উদ্যোগ নিয়ে ৪/৫ জনের একটি একটি টিম করে এই মাজার-দরবার গুলোতে গিয়ে তো তাদের শরিয়তের বিষয়গুলো বুঝানো যায়। তারা তো আর মারতে আসবে না। তাবলিগের কাজটা এখানেই শুরু করুন।

দেখবেন মাজারগুলোতে দাওয়াতের কাজে কত আনন্দ, তৃপ্তি আর মাওলার সন্তুষ্টি পান। সবাই হয়ত ঠিক হবে না। আশাও করা যায় না। কিন্তু দায়িত্বটা তো পালন করলেন।

১৯৭৭ সালে দেখেছি চট্টগ্রামের মাজারগুলো। ১৯৮০ সালে গিয়েছি সিলেটের মাজারগুলোতে। ইয়েমেন থেকে এসে শাহজালাল রহ. ও তার অনুসারীগণ বা শাহ আমানত বা অন্যান্য ইসলাম প্রবক্তাগণ ইসলামের যে সুমহান বাণী ও শরিয়াহর নীতিমালা শিখিয়ে গেছেন, তাদের মৃত্যুর পর কাজ থেমে গেছে। কারণ কোনো দ্বীনের দ্বায়ী আলেম তাদের হাল ধরেনি। খাদেম হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা ইসলামের কতটুকু জ্ঞান রাখেন তা পাঠক জানেন।

বাংলাদেশের সব বিখ্যাত মাজারগুলোর জন্য এই কথা প্রযোজ্য। সাধারণ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত কিছু দামি লেবাসধারী সুঠামদেহি সুশ্রী খাদেম মাজারগুলোর সর্বেসর্বা।

মাদরাসায় দু এক ক্লাস পড়ুয়া কিছু নামধারী আলেম অর্থলোভে মাজারে যায় ও ওরশ-মাহফিল পরিচালনা করে। জ্ঞানী আলেম ওলামাদের কোনো চান্স নাই। অথচ হাজারো-লাখো লোক মাজারগুলোতে যাতায়াত করে। একটা মায়াবি জালে সবাই আটকে যাচ্ছে।

কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলি। সত্য ঘটনা সব। অন্তত ১০/১২ টি পীরের দরবারের এবং তবলীগে সময় লাগানোর অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমি সব ব্যক্তি, দরবারের নাম বলব না।আমি একে তো অসুস্থ, তার উপর ছাপোষা মানুষ।

ইসলাম, শরীয়ত, কোরান-সুন্নাহর লেশমাত্র না থাকলেও কিছু দরবার ভন্ডামির দ্বারা খুবই শক্তিশালী। মাস্তান-গুন্ডা তো আছে, পুলিশও তাদের হাতে রাখে। দরবারগুলোর নাম নিতে খুব ভয়। আমার বুদ্ধিমান পাঠকেরা বুঝে নিবেন। সবাইকে সতর্ক করতেই আমার অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করা ।

১. ২ যুগ আগে। ঢাকার একটি বিখ্যাত দরবার। এক সময় রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীবর্গের যাতায়াত ছিল।হুজুরকে (তথাকথিত) দেখতে একদিন গেলাম। দুটি বড় গেট ডিঙ্গিয়ে মূল দরবারে ঢুকতে পারলাম না মহিলাদের ভিড়ে। বুঝলাম সুরা নূরের পর্দার আয়াত পীর সাহেবের জন্য নয়।

কিছু পর ওনি বেড়িয়ে মসজিদের টাইলস বসানোর কাজ দেখতে গেলেন, কারণ পরের দিন কোনো মন্ত্রী মহোদয় আসবেন। আমি পেছনে যাচ্ছি। সিঁড়ির একটি টাইলস বাঁকা দেখে মিস্ত্রিকে ডাকতে বললেন। মিস্ত্রি এলে টাইলস বাঁকা কেন জিজ্ঞেস করলে সে কি যেন উত্তর দিল।

পীর সাহেব একটা গালি দিয়ে তার বুকে এত জোড়ে খাবলে ধরলেন যে তার চেহারা সাদা হয়ে গেল। দমটা বের হয়নি। এখানেই পীর সাহেবকে দেখার ইতি ঘটালাম।

ও ভাল কথা, তাকওয়া না থাকলেও দরবারের এত বড় গেটে ঢাকা আর কোনো দরবারে নেই। মুরিদ ভাই-বোনারা কি গেট আর ডেকোরেশন দেখে যান কিনা বুঝা কঠিন!

২. আরেক দরবার। ঢাকার পীর সাহেবকে আমি তার জ্ঞানের জন্য সম্মান করি, জুম্মার বয়ান করলেন ২ ঘন্টা। এরকম জ্ঞান কম পীরেরই আছে। তার নামের আগে পরে ডজনের ওপর লকব আছে, তিনি নাকি সকল ইমামদের ইমাম।

যদিও তার কাছে ইমামদের যেতে দেখি না। তার মুরিদেরা বিশেষ রঙ এর আসকান ও পাগড়ি পরেন। তার মসজিদে জুম্মা পড়তে গিয়ে অবাক হলাম। গভীর কুয়া থেকে রশি দিয়ে লোটায় পানি উঠিয়ে অযু করতে হয়। এটি সুন্নত বলেন তারা। দুই মাসাধিককাল ব্যাপি মিলাদ শরীফ করেন। পাজেরো গাড়িতে করে ইসলাম প্রচার বা ওয়াজে যান (যদিও উটে চড়ে গেলে ভাল হত, কারণ পানির ট্যাপ তো ব্যবহার করেন না)।

এ গুলো নিয়ে আমার আপত্তি নেই। আপত্তি হল এক মুরিদ আমাকে বললেন, একমাত্র তারাই সহিহ দ্বীনের ওপর আছেন, বাকিরা সব ভেজাল। দরবারের গেটে কড়া পাহাড়া। ইন্টারভিউ দিয়ে ঢুকতে হত। এখন আছে কিনা জানি না। বাইরে এসে মনে হল, কই- জ্ঞানী, আলেম বা শিক্ষিত লোক তো খুব একটা নেই ।

৩. এবারের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। ৫/৬ পৃষ্ঠা লেখা যাবে, সংক্ষেপে বলি। ২৫ বছর আগে। ঢাকার বিখ্যাত মতিঝিল এলাকায় আমার মুক্তিযোদ্ধা অফিসের পাশে, মাগরিবের আগে একটি প্রেসে দাপ্তরিক কাজে বসে থাকতেই মাগরিবের আযান দেয়।

জানতে চাইলে একজন কর্মচারী মসজিদ দেখিয়ে দেয়। মসজিদে ঢুকে দেখি দুই কাতার মানুষ, সামনে ইমাম। ইমামের পেছনে একজন সুদর্শন, লম্বা, সুঠামদেহি হুজুর, তার দুই পাশে খালি। ২ জন করে দাঁড়ানো যাবে, তার পাশে কেউ দাঁড়াচ্ছে না।

আমি গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালাম এবং পেছনের মুসুল্লিদের সামনের কাতারের ফাঁকা জায়গা পূরণের জন্য ডাকলাম। কেউ আসল না। নামাজ শুরু হল। রুকুতে গেলে আমার চোখ আমার পাশের হুজুরের তবন-শেরওয়ানিতে আটকে গেল। মনে হল খুবি দামি পোশাক। ভাবছিলাম আমি কার পাশে দাঁড়িয়েছি!

যাক নামাজ শেষ পর্যায়ে ডান দিকে ছালাম ফেরালাম, বাম দিকে ছালাম ফেরানোর সাথে সাথে পেছন থেকে দুই জন আমার দুই হাত ধরে জোড়ে টানতে টানতে পেছনে নিয়ে যায়, আর বলতে থাকে ‘বেয়াদপ-তুই হুজুরের পাশে দাঁড়ালি কেন?’

আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ দেয় নি। আমার পেশাব এসে যায়। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে চলে যাই। পরে জানতে পারি তার পাশে দাঁড়ায় না কেউ, ফেরেশতা দাঁড়ায়।

এখন সবাই জানে তিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেন, ফাতেমা তার স্ত্রী। তার প্রস্তাব আল্লাহ মানে, ইরাক বার্মা নিয়ে তিনি মত বিনিময় করেন ইত্যাদি। সেদিন তার মসজিদে তার সামনে আমাকে যে অপমান করা হল, তিনি তো কিছুই বললেন না। আমি গোনাহগার হতে পারি, কিন্তু আমার অভিশাপ কি সেদিন তিনি পান নি?

কোন হক্কানী আলেম তাকে সমর্থন করে না। কিন্তু তার গর্হিত কাজগুলো তিনি করে যাচ্ছেন অবাধে।

৪. আমার চাচাত ভাবি ক্যানসার আক্রান্ত হন। ভাই কুমিল্লার চান্দিনার বিড়ি বাবার ভক্ত। তার এক কথা, বাবার সামনে বিড়ি টানলে ক্যানসার ভাল হবে। কোনো চিকিৎসাই করেন নি। বিড়ি টেনেই ভাবি মারা যান। তবুও ভাইটির বোধোদয় হয় নি। মুর্খতা কতো সীমাহীন।

রাসুল সা. সকল নেশার জিনিসকে হারাম করেছেন। বিড়ি টেনে তিনি পীর কিভাবে? ওই এলাকার কওমি হুজুরগণ কোনোদিন তার কাছে বুঝাতে যান নি। গেলে হয়ত কাজ হতে পারত।

৫. ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার (১৯৯২ সালে) বছর খানেক আগে ফুরফুরার পীর সাহেব ধামতির বার্ষিক মাহফিলে আসলেন। আমরা তার সাথে দেখা করতে গেলাম, তাদের পীরপীর এটিচিউড, খেদমত গ্রহণের মানসিকতা, নিজেই সালাম পাওয়ার উপযুক্ত, জান্নাতের কাছের মানুষ-এ রকম ভাবসাব আমার ভাল লাগত না।

(অবশ্য এখনও অনেক বিখ্যাত ওয়ায়েজিনের মধ্যে এ ভাবটি আছে। একজন ভক্ত ব্যাগ টানবে, একজন ওজুর পানি ঢালবে, একজন মশারি টেনে দেবে, পা টিপে দেয়ার কথা নাই বা বললাম। সেবা নেয়ার এ মানসিকতা কেন আপনাদের? আমি তো নিজ চোখে দেখেছি। লজ্জা বলতে কিছু নেই। অনেকের নাম বলতে পারি, বললাম না)।

যাক হুজুরের কাছে বাবরি মসজিদ নাকি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করাতে উনি ক্ষেপে গেলেন। বললেন, তোমরা এসব মিথ্যা কথায় কেন কান দাও। সব বাজে কথা। বাকি ইতিহাস তো জানে সবাই। ওনাদের এক ভাই মঞ্চে থাকলে আরেক ভাই যেতেন না। তবুও তাদের পেছনে ছুটেছি। কলেবর বৃদ্ধির ভয়ে বাকী অভিজ্ঞতা গুলো বললাম না।

৬. দেশের পশ্চিমাঞ্চলের একটি এবং কুমিল্লার একটি দরবারের কথা জানি (দুটোই ঐতিহ্যবাহী এবং বিখ্যাত মাদরাসা সমেত) যারা গৃহদাহে জর্জরিত। এক ভাই আরেক ভাইকে কাফের পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করে না।

আমার সামনেই বলেছে। আমার মনে হয়েছে, তাদের লেবাস পোশাক সবি লোক দেখানো। তাকওয়া নাই। শুধুই স্বার্থের দ্বন্দ্ব। ইসলাম কি এই শেখায়? দ্বীনি দাওয়াত কোথায়।

৭. প্রায় ৩০ বছর আগে ২৫ টি উট জবাই করে উরশ করার মাধ্যমে (আমি নিজে উটগুলো গুণেছিলাম, চট্টগ্রাম থেকে উটগুলো হাটিয়ে আনা হয়েছিল) ফরিদপুরের এক পীরের দরবার গোটা বাংলাদেশে বিখ্যাত হয়ে উঠে। যুবক বয়সে আমিও দরবারে টাকা দিয়েছি। ওখানে ইসলাম, শরীয়ত কতোটুকু শেখা যায় সে কথায় গিয়ে লাভ নেই। দুঃখই শুধু বাড়বে।

৮. নেংটা বাবাদের বা তাদের মাজারের কথা বলে লাভ নেই। কাগজ নষ্ট হবে, এদের বুঝানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসতে পারেন। বাবা ও মাজারগুলোর মধ্যে যেমন, চট্টগ্রামের ঝিনজি শাহ, লতা শাহ্, বাঁশখালী, গুই বাবা শাহ্, কাতাল শাহ্, গুনাগার আলী শাহ্, পেটান শাহ্, গাট্টি ফকির, মা’জুর অলি শাহ্, বাঘ শাহ্ ফকির, তাছাড়া আছে, কল্লা শাহ্, খরমপুর, বি. বাড়িয়া।

লুদত শাহ্ কুটান্দর, সায়েস্তাগনজ। টংটং শাহ্, লাখাই, হবিগঞ্জ। উলু শাহ্, কালাপুর, চুনারুঘাট।পতুশাহ্, কালাপুর, চুনারুঘাট। পাগলা শাহ্, ফেনী। ভেনভেনিয়া শাহ্, ফাইল্লা পাগলা শাহ্, সখিপুর, টাঙ্গাইল। পাঙ্খা বাবা, মহনগঞ্জ।

লেংটা বাবা, ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ। মাস্তান শাহ্, দূর্গাপুর, নেত্রকোনা। ছাওয়াল (বাচ্চা) পীর, শেরপুর। লেডির কান্দা, পূর্বাধলা, নেত্রকোনা। এবং জহির শাহ, বাউফল, পটুয়াখালী। গোলাপ শাহ গুলিস্থান, ঢাকা।

আরও বহু। একতরফা সবগুলো বলছি না অনেকগুলোই ভাল, বাকিগুলো বেশিরভাগ শিরক্, বিদয়াত আর পুজার আখরা। মদ-গাজা, নোংরা নাচ তো আছেই। চলছে অবাধেে। বলার কেউ নেই।

এ সকল সিলসিলার ১ম বা আসল ব্যক্তিরা ছিলেন ধর্ম প্রচারক এবং আল্লাহর অলি। কিন্তু অনুসারীরা করছে উল্টোটা। চলুন কয়েকজনকে স্বরণ করি-

তাদের মাঝে অন্যতম হচ্ছেন- হযরত শাহজালাল ইয়ামেনি রহ., শাহ সুলতান ইব্রাহীম বলখী, মহাস্থানগড়, বগুড়া; খান জাহান আলী, খুলনা; কারামত আলী জৈনপুরী রহ.- রংপুর; শাহ চরমোনাই- বরিশাল; শাহ আলী বাগদাদী-মিরপুর, ঢাকা; শারফুদ্দিন চিশতি-হাইকোর্ট, ঢাকা; গোলাপ শাহ- গুলিস্থান, ঢাকা; পীরজঙ্গি শাহ, আহসান উল্লাহ, ঢাকা।

বাবা আদম- মুন্সিগঞ্জ, শেখ মখদুম, মুন্সীগঞ্জ, আযাযিরা বিন সাঈদ, খুবরাত ইবনে ইমামুদ্দীন বাগদাদী, মুষাব্রীয়ান আলবসরী -মুন্সীগঞ্জ; বদর শাহ -লালদিঘি, চট্টগ্রাম; সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী, চট্টগ্রাম; মোহছেন আউলিয়া, গরীব উল্লাহ শাহ-মিসকিন শাহ-চকবাজার, গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারী- কালু শাহ-সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী।

আকরাম শাহ-গাজী কালু শাহ, ইমাম হাশেমী- আমানত শাহ- আকবর শাহ, শাহচান্দ আউলিয়া, নুরুল হক শাহ, কাতাল পীর শাহ -কাতালগঞ্জ, চট্টগ্রাম,,শাহ মখদুম রূপোস-পদ্মার পাড়, রাজশাহী; খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী – মখদুম শাহ দৌলা ইয়েমেনি -শাহজাদপুর, ইমাম সৈয়দ আজগড় আলী শাহ ওয়ারেছি – শাহজাদপুর।

ইমাম সৈয়দ রওশন মাওলানা ওহিদ শাহ -সামস্উদ্দিন তাব্বরেজ সিরাজগঞ্জ; বোরহান উদ্দিন – মহাস্থানগড়, শাহ ফতেহ আলী অস্করী -বড়বাজার, আদমদিঘী, কালু শাহ, শাহ বন্দেগি, বগুরা, শের শাহ-শেরপুর, শাহ আব্দুল আজিজ- গোনাকারকাঠি,[সাতক্ষীরা]।

শাহ আব্দুর রহিম-গোনাকারকাঠি,শাহ মাসুম-গোনাকারকাঠি, খান বাহাদুর আহছান উল্লাহ -নলতা,আতিউর রহমান খান – সাতক্ষীরা; সৈয়দ মুহাম্মদ আজিজুল হক – হাটহাজারী, সদর উদ্দিন আহমদ চিশতি – ঢাকা; জাহাঙ্গীর বাঈমান – ঢাকা; শাহ সূফি ফজলুল করিম ওয়ার্ছী – লালমনিরহাট; শাহ সূফি দেওয়ান – ঢাকা, শিতালং শাহ- সিলেট।

পাক বাবা হাসান শাহ্ রহ., নবীনগর, ব্রাহ্মণ বাড়িয়া,সৈয়দ গেসু দরাজ (রহঃ) ওরফে কেল্লা শহীদ, আখাউড়া, ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া,সৈয়দ শের আলী শাহ (রহঃ), আখাউড়া, ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া, হজরত আয়তুুুুল্লাহ শাহ্‌ (রহঃ) সরাইল।

এসকল ধর্ম প্রচারকদের অনুস্বরণ করলেও কিন্তু অনাচারগুলো হওয়ার কথা নয়। কড়জোড়ে অনুরোধ করে বলব আপনারা শিরক বিদয়াত কী জানুন, বর্জন করুন। দরবারের বিষয় এ পর্যন্ত থাক।

৯. তবলীগের বিষয়ে দু একটি কথা বলতে হয়। অবশ্য তবলীগ এখন ‘টক অব দি কান্ট্রি’। আমি বলব অন্য কথা।

তারা নিজের টাকায়, নিজের শ্রম-ঘামে ৪০দিন, ৮০ বা ১২০ দিন বা এক বছর ব্যাপি আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগায় বা তাদের ভাষায় নবীওয়ালা কাজ করেন। নবী ওয়ালা কাজটি আসলে কী?

রাসুল সা. বলেছেন, ‘বাল্লিগু আন্নি ওয়ালাও আ’য়াহ’-একটি আয়াত হলেও তোমরা প্রচার কর। এ বিষয়ে একজন স্কলারের একটি সওয়াল জওয়াব দেখুন- হাদীস

প্রশ্ন: هذا السائل يقول: صحة حديث: بلغوا عني ولو آية؟

জবাব: هذا صحيح رواه البخاري في صحيحه. نعم.

بلغوا عني ولو آية الواجب التبليغ عن الله ولو آية ولو حديث واحد، اللي يحفظ قوله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ[محمد:33] يبلغ، يحفظ قوله جل وعلا: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِين[البقرة:238]

এত কষ্ট করে তাবলিগ কি কোরানের কোনো আয়াত আমভাবে প্রচার করে? এক কথায় -না, খুব কম। গত ৪০ বছর ধরে আমি দেখেছি। কোরানের কথা তাদের কাছে ভয়েও বলতে পারতাম না।

ফাজায়েলের কিতাব ছাড়া, ৫/৬ টি উসুলের কথাই কোরানের কথার চেয়ে যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গাল গল্প সমৃদ্ধ জয়িফ হাদিস বেশি পাঠ করা হয়। আসলে যারা আমির থাকে তাদের বেশির ভাগই চিল্লা দেওয়া আলেম। ঠিকমত সুরা ফাতেহা পড়তে পারে না।

আর কওমি আলেমরা এগুলো চোখ বুঝে সহ্য করতেন। ‘নেহি আনিল মুনকার’ এর কোন কাজ তাবলীগ করেছে বলতে পারবেন? একটি উদাহরণ দিন কেউ! ‘আমর বিল মা’রুফ’এর কাজ করলেই চলবে।

তাহলে সেই আয়াতে তো ফেসে যাচ্ছেন- ‘আফা তু’মিনুনা বিবা’দিল কিতাবা ওয়া তাকফুরুনা বি বা’দ’ – তোমরা কি কিতাবের এক অংশকে মানবে আর এক অংশ অস্বীকার করবে?’

কেউ কি তবলিগকে দেখেছেন, দেশের বন্যা-সিডর, সুনামি-দুর্যোগে তারা কিছু করে থাকে। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তারা কোনো কথা বলেছে? রাসুলের অপমানে তারা কিছু বলে না। তাহলে নবীওয়ালার কাজ কী? তারপরও আমি তাবলীগের কাজ চালিয়ে যেতে বলব, আরও সংশোধিত হয়ে এগুতে বলব।

এ সংশোধনীগুলো কওমি-দেওবন্দী আলেমদের করা প্রয়োজন। সময় হারিয়ে এখন ওজাহাতি হয়ে প্রত্যেক দিন ওয়াজে মাহফিলে এতায়াতিদের গালাগালি করার মধ্যে কোন সুরাহা হবে কিনা জানা নেই। প্রত্যেকটি মসজিদেই এখন গাশতে সাথীদের জগড়াঝাটি নিত্যদিনের ঘটনা।

সঠিক রাস্তায় হাঁটুন, না হলে যে দুর্যোগ শুরু হয়েছে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন। কাজ সঠিক না হলে আল্লাহ পাকের গায়েবী মদদ পাবেন কিভাবে বলুন!

শেষ কথা, আপনারা মানবতাবাদী হোন, সার্বজনীন হোন। সমাজ সম্পর্কে মহাকবি আল্লমা ইকবালের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি-

‘আল্লাহর একত্ব, সার্বভৌমত্ব ও মানব ভ্রাতৃত্বই হল ইসলামি সমাজের মূল বিষয়। সমাজ ছাড়া ব্যক্তির চিহ্ন নেই। সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা ব্যক্তিকে সুসংহত করে তোলে। সমাজ জীবন মানুষের পক্ষে অপরিহার্য। বুদ্ধি, আবেগ ও উজ্জ্বল্য প্রশংসার।

কিন্তু কেবলমাত্র বুদ্ধিমত্তা যথাযথ নয়। প্রেম ও নীতির যাদুস্পর্শ ছাড়া বুদ্ধি নিরর্থক। ঈমান, চিন্তা ও আবিষ্কার সুন্দর জীবনের তিনটি নক্ষত্র।

Leave a Reply