edited-মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের উপর কিসের এত ক্ষোভ ফরিদ মাসউদের? আশরাফ মাহদি

আশরাফ মাহদি


তাবলীগ ইস্যুতে সাদ সাহেবের ভ্রান্তিগুলো নিয়ে সবচেয়ে গোছালো ও যৌক্তিকভাবে যেই আলেম মুখ খুলেছেন, তিনি হচ্ছেন মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব। যেই নামটিই যথেষ্ট একটি আস্থার পরিচয় বহন করার জন্য৷ এবং এই পরিচয় একদিনে তৈরী হয়নি। ইলমে দ্বীনের জন্য তার দীর্ঘমেয়াদী খেদমত আর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই ওলামা-তলাবারা তাকে নির্ভরযোগ্যতার উচ্চস্তরে বসিয়ে নিয়েছেন।
সাদ সাহেবের ভ্রান্তিগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর সে ব্যাপারে ব্যাপকভাবে সচেতনতা তৈরী করা প্রত্যেক আলেমের জন্যই অপরিহার্য একটি দায়িত্ব ছিল। এই দায়িত্ব এদেশের অনেক ওলামারাই পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কর্তৃক সাদ সাহেবের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন তো ছিল দাওয়াতের হিকমতে পরিপূর্ণ। বিভিন্ন জায়গায় বয়ান করার সময় তিনি ইলমী আন্দাজে, একেবারে মেপে মেপে কথা বলেছেন। ঠিক ততটুকুই বলেছেন, শরিয়তের মানদণ্ড মেনে, ইনসাফের সাথে যতটুকু বলা প্রয়োজন ছিল।
আহলে ইলমদের গঠনমূলক সমালোচনার একটি আদব বা এথিকস হচ্ছে, আদিল্লায় শরঈয়্যাহর ভিত্তিতে তারা আলোচ্যবিষয়ের প্রতি মনোযোগী হন এবং সে ব্যাপারে শরঈ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করে থাকেন, ব্যক্তি আক্রমণ এড়িয়ে চলেন। কারণ, শরিয়তের মানদণ্ড মেনে যখন আলোচনা-সমালোচনা হবে তখন শুধুমাত্র মতামতগুলোকেই শরিয়তের মানদণ্ডে মেপে বিচার করা হবে। ব্যক্তি আক্রমণ সেখানে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। যার কারণে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব সাদ সাহেবের ভ্রান্ত মতামতগুলো নিয়ে কথা বলেছেন। ব্যক্তি সাদ সাহেব নিয়ে উনি কখনোই কোন আক্রোশ দেখান নি।
এত যৌক্তিক একটি অবস্থানে থাকার পরও সর্বমহলে সমাদৃত, গ্রহণযোগ্য ও আস্থাভাজন এই মুহাক্কিক আলেমকে কেন “বেয়াদব” বলে কটাক্ষ করে বসলেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ? কেন উনার ইলমী যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে আসলেন?
অথচ মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব আজ পর্যন্ত একটিবারের জন্যেও এই ইস্যুতে ফরিদ উদ্দিন মাসউদের নাম মুখে আনেননি।
স্বয়ং নিজে একজন বিতর্কিত আলেম হয়ে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মত সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন মুহাক্কিক আলেমের নামে নিজ মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে ঘৃণার চর্চা করার সেই লজ্জাজনক চিত্র যারাই দেখেছে তারাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এবং সাদ সাহেবের ভ্রান্তির কথাগুলো মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরাতেই যে ফরিদ মাসুদের এমন প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠা, এটা তিনি স্পষ্ট করেছেন। ফরিদ সাহেব আবার দলিলও এনেছেন এর সপক্ষে। তার বক্তব্য হল, “মাওলানা তাকি উসমানী সাহেবও সাদ সাহেবের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়াকে ফতোয়া বলে মেনে নেননি।”
অথচ তকি উসমানী সাহেব কোন উসুলের অনুপস্থিতির কারণে সেটাকে ফতোয়া বলতে চান না, সেটাও ফরিদ মাসুদ সাহেবকে তিনি বলে দিয়েছিলেন। উসুলটি ছিল, “ফতোয়া লেখা হবে কর্মের উপর, এতে কারো নাম উল্লেখ থাকবেনা, যেহেতু সেখানে সাদ সাহেবের নাম লেখা আছে, অতএব সেটা ফতোয়া না”।
কিন্তু তাকি উসমানী সাহেবের এই উসুল বলার দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয়না যে উনি সাদ সাহেবের ভ্রান্তিগুলোর ব্যাপারে দেওবন্দের সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করছেন। উসুলের দিক থেকে সেটা ফতোয়া না বলা গেলেও সেটা ব্যক্তি সাদ সাহেবের ব্যাপারে দেওবন্দের অবস্থান। এমনকি পাকিস্তানের তাবলীগের অবস্থান থেকে এটাই স্পষ্ট যে, সেখানে সাদ সাহেবের ভ্রান্তিগুলোর প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে আলেমদের ও জনসাধারণের ভেতর কোন ধরণের মতবিরোধ নেই। অতএব তাকি সাহেবকে সাদ সাহেবের পক্ষের ভ্রান্তিকে সমর্থনকারী ভাবার কোন কারণ নেই।
অথচ ফরিদ উদ্দিন মাসউদ নিজের “ইজতিহাদ” অনুযায়ী এ কথা বুঝে নিলেন যে, তকি উসমানী সাহেব সেটাকে ফতোয়া না বলার অর্থ হচ্ছে সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে তাকি সাহেব স্বীকার করছেন না। আর যেখানে তকি সাহেব স্বীকার করছেন না সেখানে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কেন সেই ভ্রান্তিগুলো নিয়ে কথা বলবেন? অতএব মাওলানা আব্দুল মালেক “উস্তাদের বিরুদ্ধে” চলে গিয়েছেন, এবং “বেয়াদব” হয়েছেন।
এ কেমন ইজতিহাদ!!!
উনার আরেকটি দ্বিমুখী বিষয় হচ্ছে, এই আলোচনার শুরুতে যেই ফরিদ উদ্দিন মাসউদ ফিতনাবাজ বলে গালিগালাজ করলো পাকিস্তানপন্থী আলেমদের, সেই উনিই আবার একটু পর এসে তাকি সাহেবকে দিয়ে তার কথার স্বপক্ষে দলিল দাঁড় করাতে চাইলেন!
তবে হ্যাঁ, একজন আলেম হিসেবে শরীয়তের মানদণ্ড অনুযায়ী উনি মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মতের সমালোচনা করতেই পারতেন, যদি আব্দুল মালেক সাহেব ব্যক্তিগত কোন ইজতিহাদ পেশ করতেন। এতে আপত্তির কিছু থাকতো না। কিন্তু আব্দুল মালেক সাহেব তো সাদ সাহেবের ভ্রান্তিগুলো নিয়ে কথা বলেছেন, অতএব এ কারণে যদি আব্দুল মালেক সাহেবের বিরোধীতা করতে হয় তাহলে তো সাদ সাহেবকে আগে সঠিক প্রমাণ করে নিতে হবে। সেটা কি ফরিদ সাহেব পারবেন?
আসলে ইলমী কোন তর্কে আব্দুল মালেক সাহেব কেন, তার ছাত্রের ছাত্রদের সাথেও এই দরবারী ধারার লোকজনের কথা বলার যোগ্যতা আছে কিনা সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। উনাদের আছে শুধু চাটুকারিতার বিনিময়ে সরকার বাহাদুরের দরবার থেকে পাওয়া খানিকটা ক্ষমতার ঘ্রাণ। যার মাধ্যমে তারা পুরো দুনিয়ার সব হকপন্থী আলেমদের বিরোধীতা করার দুঃসাহস অর্জন করে। ইলমী তর্ক করতেও তাদের কোন শরয়ী ইলম বা শরয়ী যুক্তির প্রয়োজন হয় না।
তবে মাঝেমধ্যে তারা যাও একটু মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তির চর্চা করার চেষ্টা করে থাকে সেটাও হয়ে দাঁড়ায় কুযুক্তি। যেমন, গত পরশু ইকরার সে আলোচনায় ফরিদ সাহেব শরয়ী পরিভাষার বাইরে গিয়ে জমহুর শব্দের মনগড়া একটা ব্যাখ্যা করে বসলেন, “আল্লাহর নবী যদি মক্কার জমহুরের কথা শুনতেন তাহলে ইসলাম প্রচার করা হত না। কারণ তখন জমহুর ছিল মক্কার কাফেররা” তাই উনি এইসব জমহুর টমহুর কিছুই মানেন না।
ভাল কথা। কিন্তু সেই মক্কার জমহুর কাফেরদের সাথে যে উনি আমাদের আলেমদের জমহুরকে কিয়াস করে মিলিয়ে ফেললেন, এরপরও কি উনার ইলমী যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অনুমতি চাইতে হবে!
এইভাবে শরঈ পরিভাষার অর্থের তোয়াক্কা না করে যদি উনি মুজাম বা লুগাত খুঁজে খুঁজে শাব্দিক অর্থ বের করে সেই অনুযায়ী শরঈ হুকুম লাগানো শুরু করেন তাহলে তো সালাত শব্দের শাব্দিক অর্থ খুঁজে পেলে উনি নামাজ পড়া থেকে “উনার উম্মতকে” অব্যাহতি দিয়ে বলবেন, আজ থেকে দিনে পাঁচবার একটু কোমর দুলিয়ে নিলেই হবে, নামাজের কোন প্রয়োজন নেই। (মাআযাল্লাহ)
একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, এই যুগের দরবারীদের ইলমী ও চিন্তাগত দৈন্যদশার ফলে তাদের সব সমালোচনার মানদণ্ড ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। ইলমী দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি মতকে খণ্ডন করে যৌক্তিকভাবে কিভাবে অন্য একটি মত প্রাধান্য পেতে পারে, এ নিয়ম মেনে উনাদের আপনি কোন ইলমী আলোচনা করতে দেখবেন না। অথচ ইলমী তর্কের ক্ষেত্রে এটা মৌলিক একটা বিষয়।
এই মূলনীতিকে পাশ কাটিয়ে উনারা সরাসরি প্রতিপক্ষকে ব্যক্তি আক্রমণ করে বসেন। আর এই আক্রমণই হচ্ছে উনাদের “সমালোচনার” মূল ভিত্তি। দু’দিন আগে উনার ছেলের কুযুক্তিপূর্ণ স্ট্যাটাস, আর এরপর ইকরায় উনার প্রতিক্রিয়াশীল ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য তাই প্রমাণ করে।
অথচ আগের যুগে দরবারী আলেমরাও এদের চাইতে ঢের বেশি জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন৷ মুফতি আমিনী রহ. বলতেন, বাদশাহ আকবরের দরবারের একজন দরবারী আলেম তাফসিরে বে নুকাত লিখেছিল। অর্থাৎ একজন অনারব হয়ে পুরো তাফসির গ্রন্থ আরবিতে রচনা করার সময় এমন কোন হরফই আনেনি যার মধ্যে নুকতা আছে। আরবি ভাষায় কি পরিমাণ দক্ষতা ছিল সেকালের হিন্দুস্তানি দরবারী আলেমদের!
ফরিদ সাহেব হয়তো বলতে চাইবেন যে, আমিও সাদ সাহেবের ভ্রান্তির পক্ষে না। কথার মারপ্যাঁচে বেচে যাওয়ার জন্য যেটা উনি বলেছেনও বেশ কয়েকবার। তবে সাদ সাহেবের ভ্রান্তি নিয়ে যদি উনার কোন দ্বিমত নাই থাকে তাহলে কেন এত ফিতনার ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছেন? তাবলীগ সংকট সমাধানে এগিয়ে আসা ওলামাদেরকে উনি কেন তৃতীয় পক্ষ বলে আখ্যায়িত করে তাদের সরে যেতে বলছেন? কেন সাদ সাহেবকে ‘মাগলুবুল হাল’ বলে তাবীল করে উনাকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন?
আসলে অবস্থান যখন এতটাই অস্বচ্ছ ও অনৈতিক হয়ে থাকে তখন কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে পার পাওয়াটাই একমাত্র উপায়। এ জন্যেই, এই ইস্যুতে উনার কোন অবস্থানই এখন পর্যন্ত উনি স্পষ্ট করতে পারছেন না। কারণ, বেশি স্পষ্ট করতে গেলে ইজতেমার ময়দানে সেদিনের হামলার মূল ইন্ধনদাতাদের তালিকা সামনে চলে আসতে পারে। তাই এখন সাদ সাহেবকে বাঁচাতেই পরোক্ষ এক ব্যস্ততায় ঢুকে পড়েছেন তিনি৷ আর সেই ব্যস্ততায় যেই বাধা দেবে তার দিকেই তিনি ছুড়বেন তার নোংরা সমালোচনার বিষাক্ত তীর৷ হোক যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব বা তার মত অন্য কোন আলেমে দ্বীন।
আল্লাহ তায়ালা এদের ফিতনার বিষাক্ত ছোবল থেকে আমাদের হেফাজত করুক, এই দুয়া করতে হবে। এবং সর্বাত্মকভাবে এদের বর্জন করার আওয়াজ তুলতে হবে।

Leave a Reply