টঙ্গি-ট্রাজেডি : সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের অনিবার্যতার এক হৃদয়-বিদারক দৃষ্টান্ত- লিড

পাঠক যখন এই লেখাটি পড়ছেন তখন সম্ভবত সারাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশ বিরাজ করছে। উদ্ভূত পরিবেশ-পরিস্থিতির মূল্যায়নও নিশ্চয়ই প্রত্যেকে নিজের মতো করে করেছেন। এই মুহূর্তে ঐ বিষয়ে না গিয়ে নির্বাচনপূর্ব একটি বিষয়েই দুটো কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।

বিগত ১ ডিসেম্বর ২০১৮ টঙ্গির ময়দানে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে তার ক্ষত এখনও তাজা। ঐ ঘটনা, তার আগে পরের বিভিন্ন ঘটনা এবং সেসবের জের, যা এখনও ঘটে চলেছে- এই পুরো বিষয়টির উপর আমাদের সকলের খুব শান্তভাবে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। এখানে সকল ‘পক্ষে’রই শিক্ষা গ্রহণের অনেক কিছু আছে।

মুসলিম হিসেবে আমরা সকলেই কুরআন-সুন্নাহ মেনে চলতে বাধ্য। জীবনের সকল কাজ আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে শরীয়তের বিধানের আলোকেই। এই মানদ-কে সামনে রেখে টঙ্গির ঘটনাকে যদি বিচার করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে ঐ হামলা ও আক্রমণের বিষয়টি ছিল মারাত্মক গুনাহের কাজ, যা একশ্রেণির মুসলমানের দ্বারা সংঘটিত হয়ে গেছে। জায়েয না-জায়েযের সঠিক ইলম না থাকলে দ্বীনী বেশভূষাধারীরাও কত বড় কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে টঙ্গির ঘটনাটি এর একটি দৃষ্টান্ত। যে শ্রেণিটি এতদিন পর্যন্ত ইলম ও উলামার অবজ্ঞা করেছে, তাদের দ্বারাই সংঘটিত হল অজ্ঞতাজনিত এই কবীরা গুনাহ। কিছুমাত্র দ্বীনের প্রজ্ঞা থাকলেও বোঝার কথা যে, গুনাহ ও নাফরমানীতে লিপ্ত হওয়াও আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আসা শাস্তির একটি প্রকার। কেউ যখন আল্লাহর কোনো নিআমতের অবমাননা করে তখন সে ঐ নিআমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। সহীহ ইলমের নিআমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কুফল যে মানুষের চিন্তা ও কর্মকে কী রূপ বিপথগামী করতে পারে টঙ্গির ঘটনায় তার একটি নমুনা দেখা গেল। তবে হাঁ, এই বিষয়টি বোঝার জন্যও চাই আখিরাতমুখী চিন্তা-চেতনা ও স্বচ্ছ দ্বীনী দৃষ্টি। যে দৃষ্টিতে কারো মাজলুম হওয়ার চেয়ে জালিম হওয়া অনেক বেশি ভয়াবহ।

ঐ ঘটনার আগেও আমাদের প্রাজ্ঞ উলামা ও মুরব্বীগণ বারবার সতর্ক করেছেন যে, ইতিমধ্যে নিযামুদ্দীনের এতাআতের দাবিদার শ্রেণিটির মাধ্যমে অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে, একজনের ভুল প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পরও তার পক্ষে জিদ ধরে থাকা, দেশের মান্যগণ্য উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে কুৎসা রটানো, গীবত-শেকায়েত, মিথ্যাচারের মতো গুনাহে লিপ্ত থাকা, কোথাও কোথাও হামলা-আক্রমণের মতো ঘটনাও ঘটতে থাকা ইত্যাদি যা হয়ে গেছে তা যেন আর না হয়, অন্তত একে অপরের হক নষ্ট করার মতো ভুল যেন না করি- এ বিষয়ে বারবার হুঁশিয়ার করেছেন। এসবের মধ্যেই টঙ্গির ময়দানে শত শত উলামা-তলাবা ও তাবলীগের সাথীর উপর ন্যক্কারজনক এই হামলার ঘটনাও ঘটল। এই সব কিছুর পরও কি ঐ বন্ধুরা দাবি করতে পারে, তারা হকের উপর আছে? টঙ্গির মর্মান্তিক ঘটনার পর তো কারো মনেই কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। এখন তো অন্তত তওবা করে ফিরে আসা কর্তব্য।

দ্বীনের নামে কোনো কাজ করতে গিয়ে, কারো এতাআত করতে গিয়ে যদি নিজের আখিরাত বরবাদ হয়ে যায়, তাহলে থাকুক না সেই কাজ, সেই এতাআত! পরবর্তী যুগের বিশেষ কোনো একটা পন্থা বা ব্যক্তির উপর তো দ্বীন ও দ্বীনের মেহনত নির্ভর করে না, এই পন্থার আগেও দ্বীনের কাজ ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে ইনশাআল্লাহ! প্রত্যেকের কর্তব্য, নিজের আখিরাত সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

এই ঘটনার পর কিছু লোকের হঠকারিতা ও আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড- যেন আরো বেড়ে গেছে। কেউ কেউ আলিম-উলামা ও দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলোর কুৎসা রটনায় যেন উঠেপড়ে লেগেছেন, কেউ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলিমদেরকে ফোনে উত্যক্ত করছেন, এরপর সেগুলো নেটে ছেড়ে দিয়ে তাদেরকে হেয় করার চেষ্টা করছেন অথচ এই বন্ধুরা উপলব্ধি করতে পারছেন না, এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে অভদ্র ও নির্বোধ হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরছেন। আমরা আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাই, এইসকল কর্মকাণ্ড- বাদ দিয়ে সুপথে আসুন। অন্যায়-অনাচার শুধু আপনাকে দুনিয়াতেই মানুষের কাছে অভদ্র এবং ফিতনাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করবে না, আখিরাতেও আপনি অপরাধী হিসেবে ধরা পড়ে যাবেন। কারণ এইসকল কাজ এবং কী উদ্দেশ্যে তা করা হচ্ছে- তা কি আমলনামায় লেখা হচ্ছে না?

আমাদের যেসব তাবলীগের সাথী উলামায়ে কেরামের সাথে রয়েছেন, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে হেদায়েতের উপর অটল রাখুন, তাদেরও কর্তব্য- এই পরিস্থিতিতে সবর ও সংযমের পথে অবিচল থাকা। টঙ্গির ময়দানে উপস্থিত উলামা-তলাবার সাথে তাঁরাও যে সবরের পরিচয় দিয়েছেন, সেই অবস্থান এখনো ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি দ্বীনের দাওয়াত ও মেহনতে আগের চেয়েও বেশি শ্রম ও সময় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদরাসার উলামা-তলাবা তাদের একটি দ্বীনী দায়িত্ব পালনার্থেই তাদের সাথে বেশি সময় দিচ্ছেন। একটি নতুন গোমরাহী যেন আম জনতার মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে না পারে এজন্য তারা তাদের দ্বীনী যিম্মাদারী পালন করে যাচ্ছেন। তাদের এই ত্যাগ ও কুরবানীর মূল্যায়নের এক উপায় হচ্ছে ঐ বিভ্রান্তি থেকে নিজেও মুক্ত থাকা, অন্যকেও মুক্ত রাখার চেষ্টা করা। এর পাশাপাশি সঠিক নিয়মে তাবলীগের মেহনত জারি রাখা। মেহনতের সাধারণ তাকাযাগুলো পূরণে নিজেরা আরো বেশি উদ্যমী হয়ে ওঠার চেষ্টা করা এবং মাদরাসার উলামা-তলাবা দ্বীনের যে মহান অঙ্গন- দ্বীনী তালীম ও তাআল্লুমে মশগুল রয়েছেন, সে অঙ্গনেও তাদের সহযোগী হওয়া। মাদরাসার উলামা-তলাবা যেমন দ্বীনের দাবি পূরণে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাদেরও কর্তব্য দ্বীনের দাবি পূরণে উলামা-তলাবার পাশে থাকা। এভাবে ইখলাসের সাথে নেক কাজ ও খোদাভীতিতে পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বারা দ্বীনের সকল অঙ্গনের কাজ সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

একইসাথে আমাদের হকপন্থী সকলের আরো সচেতনতা ও সতর্কতা কাম্য। কারো শুধু মুখের কথায় বা বেশভূষায় প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। এই বাস্তবতা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, হকপন্থী, খোদাভীরু মানুষেরা নিজেদের যে পরিবেশে বিচরণ করেন এর বাইরেও ভিন্ন রকমের পরিবেশ থাকতে পারে, নিজেদেরকে পরস্পর যেমন দেখেন এর চেয়ে ভিন্ন স্বভাবের লোকজনও থাকতে পারে। একারণে শুধু কারো মুখের কথায় যেমন প্রতারিত হওয়া ঠিক নয় তেমনি কারো শুধু বেশভূষা থেকেই সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হয়ে যাওয়া উচিত নয়। টঙ্গির ময়দানের ঘটনাটি এক্ষেত্রে একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। কাজেই সতর্কতা ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ইসলাম আমাদের শুধু কুধারণা থেকেই বাঁচার আদেশ করেনি, সতর্কতা অবলম্বনেরও আদেশ করেছে। অতি সুধারণা এই সতর্কতার পরিপন্থী।

টঙ্গি ময়দানের ঐ ঘটনায় আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন। যারা নিহত হয়েছেন আল্লাহ তাদের জান্নাত নসীব করুন, যারা আহত হয়েছেন তাদের সুস্থ ও সক্ষম করে দিন। আর যারা সেদিন জালিমের ভূমিকায় ছিলেন আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুন।

Leave a Reply