তাবলীগ জামাত বিভক্তির কারণ- সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী- বাদ

মাওলানা ইলিয়াছ রহ. এর দাওয়াতের মাকসাদ হল, রাসূল সা. এর ওফাতের দিন উম্মত যে অবস্থায় ছিলো, সে অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া।

ইলিয়াছ রহ. এর দরদ আর ব্যথা এমন ছিলো, যার ফলে
তিনি উম্মতকে এমন একটা প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, পুরো উম্মত এক শরীর, এক দেহ, এক কলবে পরিণত হয়েছিল।
যেখানে কোন ধনী-গরীব, সাদা-কালো, আরব-আজম, মালিক-শ্রমিক, উঁচু-নীচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহুরে-গ্রাম্য কোন ভেদাভেদ ছিল না। পুরো উম্মত বসে যেত এক দস্তরখানে।

তাহলে এই উম্মত দুই ভাগে বিভক্ত কেন?

আগে আলেমরা তাবলীগের কাজে সময় দিতেন, তাবলীগী ভাইদের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। যারা ব্যস্ততার দরুন সময় দিতে পারতেন না, তারা সম্ভাব্য সব উপায়ে দাওয়াত ও তাবলীগের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।
কিন্তু আজ কী হলো,
এতায়াতী নামে একদল লোককে দেখা যাচ্ছে আলেমদের ভুল ধরতে!
আপনাদের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন “বলেন দেখি, এই কাজটা শুরু হলো কার মাধ্যমে?”
তিনি তো একজন আলেম ছিলেন। হিন্দুস্তানে উম্মতের গোমরাহি দেখে পেরেশান হয়ে চলে গিয়েছিলেন মক্কায়। সেখানে স্বপ্নযোগে রাসূল সা. তাকে এই কাজের ইশারা করেন।
ইঙ্গিত পাওয়া মাত্রই তিনি এ কাজ শুরু করেননি বরং এ কাজের তারতীব তিনি তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুফতী কিফায়তুল্লাহ রহ., মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী রহ., মাওলানা হোসাইন আহমদ মদনী রহ., মাওলানা রায়পুরী রহ., শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. প্রমুখ।

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর সামনে এ কাজের তারতীব উপস্থাপন করলে তিনি বলেছিলেন, এ কাজ তো বহুত উঁচা কাজ! আঞ্জাম দিবে কে?
কিন্তু পরবর্তী সময়ে থানভী রহ. এ তাবলীগ জামাতের কাজকর্ম দেখে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, আমার ইলিয়াছ তো নিরাশাকে আশায় পরিণত করে দিয়েছে!
.
আর বাংলাদেশে যিনি এই কাজ নিয়ে এসেছেন, তিনি হলেন বড় হুজুর মাওলানা আব্দুল আজিজ রহ.। আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (সদর সাহেব হুজুর) এর নির্দেশে তিনি বাংলাদেশ থেকে হিন্দুস্তান গিয়ে কাজের তারতীব শিখে তা বাংলাদেশে চালু করেন। তিনিও তো আলেম ছিলেন!
.
উপরোক্ত কথাগুলোর একটিই উদ্দেশ্য, এ কাজের প্রচার-প্রসারে ওলামায়ে কেরামের অপরিসীম অবদান রয়েছে এটা বোঝানো।
কিন্তু আজ কেন ওলামায়ে কেরামের সাথে এতায়াতী সাথীরা বিদ্বেষ পোষণ করছেন? আগে যাদের দেখলে সালাম-মুসাফাহা, হাদিয়া-তোহফা দেয়ার জন্য ভীড় জমাতেন, আজ কেন তাদেরকে ওরা সহ্য করতে পারছে না? বরং দুশমন মনে করছেন?
টঙ্গী ময়দানে তালিবানে ইলমকে রক্তাক্ত করেও অবুঝ সাথিরা বলাবলি করছে, ঈমানহারাদের বিতাড়িত করেছি, এমন রেকর্ডও আমার কাছে এসেছে।
কেন ভাই? কী হয়ে গেলো আজ তোমাদের?
.
আহ! অন্তরটা ফেটে যায়, নিজের জান হাতে নিয়েই এখন চলাফেরা করতে হয়! ওয়াল্লাহ! আমারও হযরত মারয়াম আ. এর মতো বলতে ইচ্ছা করে, হায়! আমি যদি এ দৃশ্য দেখার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করতাম!
আহ! এ দৃশ্য যে কলিজাটাকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে!
.
অনেকেই বলে, বাংলাদেশের আলেমরাই তাবলীগকে দুভাগ করে দিয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও তাবলীগ দুভাগ হয়নি!
আহ! ভাইরে! এতো মিথ্যাচারের কী প্রয়োজন!
গত ৩০ মে ২০১৮ মালোশিয়া ইজতিমা লেটার হাতে আসলে শুরু হয় আমার তল্লাশি সেখানেও তো তাবলীগ দুভাগে বিভক্ত! দুবাই, সৌদী আরব, মালদ্বীপ, ভারত সহ বহু রাষ্ট্রেই তো সফর হয়েছে ! সর্বত্রই তো ভাঙনের সুর!
.
গত মাসে আমেরিকার শরয়ী কাউন্সিলের ( আবার সরকার অনুমোদিত) ৫০ জন সদস্য স্বাক্ষর করেছে, যে তারা এই ব্যাপারে দেওবন্দের সাথে একমত।
তারা তুখোড় ইংরেজী, আরবী, উর্দু জানার পরও দেওবন্দকে অনুসরণ করার ঘোষণা দেয় , আর আপনি দেওবন্দকে স্বীকারই করতে পারছেন না!
.
আসল কথা! তাবলীগ জামাতের এই কোন্দল, ফাটল, গ্রুপিং, ভাঙনের কারণ কী?
আমার মতে, এ বিভক্তির মূল কারণ হচ্ছে ৩ টি।
.
১. তাবলীগের এই মেহনত ৩ হজরতজী ( মাওলানা ইলিয়াছ রহ., মাওলানা ইউসুফ রহ., মাওলানা এনামুল হাসান রহ.)’র উসুল থেকে সরে যাওয়ায় ফিতনা শুরু হয়েছে ।
তিন হজরতজীর ৭৫ বছরের তাবলীগে কারো দ্বিমত ছিলোনা।
.
২. অতীতের সময়গুলো এ মেহনতেরর মিম্বার থেকে শুধুমাত্র ৬ নাম্বারের আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল।
থানভী রহ. একবার ইলিয়াছ রহ. কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মৌলভী ইলিয়াছ! এখন তো তোমার জামাতের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত! চার মাজহাবের , ভিন্ন ভাষার, ভিন্ন তরিকার সবাই এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে! আমি আশংকা করছি পরবর্তী সময়ে, না জানি কোন ফিতনা সৃষ্টি হয়!
প্রত্যুত্তরে হজরতজী ইলিয়াছ রহ. বলেছিলেন, হযরত! আমি তাবলীগের জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করেছি। সবাইকে এই সীমার ভেতরেই তাবলীগ করতে হবে। এখানে শুধুমাত্র ছয় উসুলের আলোচনা হবে। চাই তিনি যে মাজহাবের হোকনা কেন, তিনি যে ভাষার, যে গোত্রেরই হোকনা কেন, ছয় নাম্বার থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
এই মিম্বার থেকে শুধু ফাজায়েলের আলোচনা হবে , আর মাসায়েল, ওলামায়ে কেরামের খেদমতে সোপর্দ করা হবে।
আর যখন ছয় নাম্বার থেকে বের হওয়া শুরু হলো, ফিতনা তাবলীগকে ঘিরে ফেললো।
এখন তো বের হতে হতে নবীদেরকেও ছাড় দেয়া হচ্ছেনা। আম্বিয়ায়ে কেরামের দোষত্রুটি বের করা হচ্ছে, আরে ভাই! হেদায়েতের মালিক আল্লাহ নয়, এই কথা বলে আল্লাহকে পর্যন্ত ছাড় দেয়া হচ্ছেনা!
মাদরাসায় যাকাত দেয়া যাবেনা, ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল নিয়ে নামাজ পড়লে নামাজ হবেনা!
এগুলোর সাথে ছয় নাম্বারের সম্পর্ক কী?
আপনারই বলুন !
.
৩. নিজেকে একক আমীরের দাবী করা। এ ফিতনার অন্যতম।
.
অনেকেই বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে , মাওলানা সাআদ সাহেব নাকি রুজু করেছেন!
আমি তো বলি, রুজু করতে হবে কেন? তিনি যদি মাত্র কয়েক লাইনের একটি চিঠি কাকরাইলসহ সারা দুনিয়ার মারকাযগুলোতে পাঠিয়ে দেন যে, আমি আমার বর্তমান অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ালাম।

۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔ ছবি

সবাই জমহুর ওলামায় কেরামের সাথে থেকে
আমার যেসব কথা সম্পর্কে আহলে ইলমরা আপত্তি তুলেছেন, সেগুলো বর্জন করুন! তিন হজরতজীর আমলে তাবলীগের মেহনত যেভাবে চলমান ছিলো, এখনও সেভাবে চালাতে থাকুন!
ব্যস! মাত্র এতটুকু হলেই যথেষ্ট!
কিন্তু তিনি কি উম্মতের দিকে তাকিয়ে এতটুকু কাজ করবেন ?
আদৌ কি তাঁর দাঁড়া সম্ভব?

Leave a Reply